টাঙ্গাইল
শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে বাতিঘর পাঠাগার

টাঙ্গাইলে রেলস্টেশন বাস স্টেশন এবং সেলুনে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার, ছবি : আগামীর সময়
টাঙ্গাইলে রেলস্টেশন, বাসস্টেশন ও সেলুনে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার। এসব জায়গায় সার্ভিসের জন্য অপেক্ষার সময়টুকু বই পড়ে কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, টাঙ্গাইলের বিভিন্নস্থানে বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার অপেক্ষামান যাত্রীদের সেলুন, রেল স্টেশন এবং বাস স্টেশনে বাতিঘর আদর্শ পাঠাগারের আদলে অনুপাঠাগার গড়ে তুলেছেন।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কুইজবাড়ী, আয়নাপুর, চৌরাকররা, নন্দবালা, মগড়া বাজার ও কালিহাতী উপজেলার পালিমা বাজারে মোট ১০টি সেলুনে অণুপাঠাগার চালু হয়েছে।
কুইজবাড়ী বাজারের গোবিন্দ হেয়ার ড্রেসার নামের একটি সেলুনে গিয়ে দেখা যায়, সেলুনের এক কোণায় ২০-২৫টি বই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। চুল কাটাতে এসে যারা অপেক্ষমাণ তারা সবাই বই পড়ছেন।
সেলুনের সত্ত্বাধিকারী গোবিন্দ চন্দ দাস জানান, অনেকদিন ধরে তার দোকানে বই পড়ার এ কার্যক্রম চালু হয়ছে। দোকানে সেবা নিতে আসা লোকজন অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ধৈর্য হারায় না। কারণ, তারা বই পড়ে সময় কাটাতে পারেন।
চুল কাটাতে আসা রিপন মিয়া বললেন, চুল কাটাতে এসে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হলেও এখন আর বিরক্ত লাগে না। অবসর সময় এখানে অনেক ছাত্রও বই পড়তে আসেন।
এদিকে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ডে কয়েকটি বাস কাউন্টারে অণু-পাঠাগার স্থাপন করা হয়েছে। বাসের জন্য অপেক্ষা করে এখন আর যাত্রীদের সময় নষ্ট হবে না, বরং বই পড়েই কেটে যাবে মূল্যবান সময়। এ উদ্যোগে খুশি হয়েছেন বাসযাত্রীরা।
সরেজমিন টাঙ্গাইল নতুন বাসস্ট্যান্ডের সকাল-সন্ধ্যা বাসকাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, দেয়ালে সাঁটানো ছোট বুকসেলফে বিভিন্ন ধরনের বই রাখা। যেখান থেকে অপেক্ষমান যাত্রীরা তাদের পছন্দমতো বই নিয়ে পড়ে সময় কাটাচ্ছেন।
কথা হয় আরেক যাত্রী খন্দকার মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, চাকরির সুবাদে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকাতে প্রায়ই যাতায়াত করতে হয়। অনেক সময় বাসের জন্য অপেক্ষা করি। এ সময় বই পড়ার ব্যবস্থা একটা চমৎকার উদ্যোগ।
অপরদিকে টাঙ্গাইল রেলস্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জন্য স্টেশন অণুপাঠাগার গড় তুলেছেন। স্টেশনের মূল প্ল্যাটফর্মে কাঠের একটি বুকসেলফ স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে সাজানো বই থেকে যাত্রীরা তাদের পছন্দের বই নিয়ে পড়ে আবার জমা দেন।
টাঙ্গাইল থেকে ঢাকাগামী সিল্কসিটি ট্রেনের অপেক্ষমাণ যাত্রী রাকিব হোসেন বলছিলেন, ‘এটি খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ট্রেনের জন্য বিভিন্ন সময় স্টেশনে অপেক্ষা করতে হয়। এখানে সুন্দর পরিবেশ রয়েছে বই পড়ার। অপেক্ষার সময়টুকু এখন আমরা বই পড়ে আনন্দের মধ্যে কাটাতে পরছি।’
২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কামরুজ্জামান নিজের সংগ্রহ আর বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে পাওয়া প্রায় ১০০টি বই নিয়ে বাড়ির একটি কক্ষে চালু করেন পাঠাগার। বর্তমানে দুই হাজারের অধিক সংখ্যক বই রয়েছে।
বাতিঘর আদর্শ পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা কামরুজ্জামান মাধ্যমিক পাসের পর গ্রাম ছেড়ে টাঙ্গাইল শহরে চলে যান। সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে অপরাধ তত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগে সম্মান শ্রেণিতে পড়ার সময় নিজ গ্রামে গড়ে তোলেন পাঠাগার। নাম দেন ‘বাতিঘর’। সেই বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার এখন আলো ছড়াচ্ছে গ্রামের ঘরে ঘরে।
গ্রামাঞ্চলে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে বই পড়া আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য কামরুজ্জামান তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন নানা সম্মাননা।
এদের মধ্য প্রথমআলো বন্ধুসভা সম্মাননা-২০২১, পাঠশালা ইমার্জিং লিডার অ্যাওয়ার্ড-২০২২, ইস্টিশন পাঠাগার সম্মাননা-২০২৩, আলোর ফেরি পাঠাগার ডিজিটালাইজেশন সম্মাননা, বাংলাদেশ বুকওয়ার্মস অ্যাসোসিয়েশন বিশেষ সম্মাননা-২০২৪ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
কামরুজ্জামানের বাড়ি টাঙ্গাইল সদরের মগড়া ইউনিয়নের চৌরাকররা গ্রামে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে চাকরি করছেন বাংলাদেশ পুলিশে উপপরিদর্শক (এসআই) পদে। কর্মরত আছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই)।
পাঠাগারের কার্যক্রম পরিচালনা করে গ্রামেরই কলেজপড়ুয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদের একজন মো. হাবিবুর রহমান। তিনি লায়ন নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী।
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। এ সময়ের মধ্যে বই দেওয়া-নেওয়া চলে। একটি বই ১৫ দিনের জন্য দেওয়া হয়। কারও পাঠাগারে আসতে অসুবিধা হলে ফোন করলেও বই পৌঁছে দেওয়া হয়।
পাঠাগারে কথা হয় মগড়া উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে। তার ভাষ্য, এই পাঠাগার হওয়ায় তাদের বই পড়ার খুব সুবিধা হয়েছে। চাইলেই বই নিয়ে আসতে পারে।
গ্রামের মধ্যবয়সী ব্যবসায়ী ছানোয়ার হোসেন জানান, অবসর সময়ে তার বই পড়ার অভ্যাস। তাই এই পাঠাগারের সদস্য হয়েছেন। এখান থেকে বই নিয়ে নিয়মিত পড়েন।
পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান মাহিম জানান, আশপাশে কোনো পাঠাগার না থাকায় বই পড়তে হলে প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো। যা অনেক কষ্টসাধ্য ও দূরহ ছিল। তাই ইচ্ছা থাকলেও সবসময় সুযোগ পেতাম না। এই পাঠাগার প্রাতিষ্ঠার ফলে আমরা খুব সহজে বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছি।
চৌধুরীমালঞ্চ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সানোয়ার হোসেন বলছিলেন, পাঠাগারটি সাধারণ মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে যা তাদের ভবিষ্যৎ আলোকিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা কামরুজ্জামানের বাবা শাহজাহান জানান, প্রথমে যখন কামরুজ্জামান পাঠাগারটি স্থাপন করে, তখন মনে হতো পাগলামি করছে। কিন্তু কিছুদিন যেতেই দেখতে পেলাম এটি খুব ভালো উদ্যোগ। তাই তিনি বাড়ির ঘরটি ব্যবহার করতে দিচ্ছেন।
কামরুজ্জামান জানান, অনেক মানুষ আছেন যারা বই পড়তে ভালোবাসেন। তবে নিয়মিত কিনে পড়ার সামর্থ যাদের নেই তাদের জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। তিনি না থাকলেও পাঠাগারটি যাতে টিকে থাকে, সে জন্য কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। পাঠাগার পরিচালনার জন্য গ্রামের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমন্বয়ে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করে দিয়েছেন। তাদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছে এই পাঠাগার।
কামরুজ্জামান বললেন, প্রযুক্তির আসক্তি কাটিয়ে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরি লক্ষ্যে আমাদের ছুটে চলা। আমাদের এ কার্যক্রম পুরো জেলায় ছড়িয়ে দিতে চাই।




