বেতাগীতে বেহুন্দি-খুঁটিজালে হুমকির মুখে ইলিশের প্রজনন

সংগৃহীত ছবি
নদীর বুক জুড়ে সারি সারি বাঁশের খুঁটি। সেসব খুঁটিতে পাতা বেহুন্দি ও খুঁটিজাল। কোথাও কোথাও নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড় পর্যন্ত জালের বেড়া। বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিষখালী নদীর চিত্র এখন এমনই। এসব জালে আটকা পড়ছে মা ইলিশ, জাটকা। প্রজনন ও উৎপাদন নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। শুধু ইলিশ নয় জালে আটকা পড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে স্বাভাবিক বিচরণ।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, বেহুন্দি ও কারেন্ট জালের বিস্তারে নদীটির বড় একটি অংশ কার্যত মাছ ধরার ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এতে একদিকে ইলিশের বংশবিস্তার হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ জেলেরা। নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে তাদের জাল ছিঁড়ে যাচ্ছে, আবার মাছ কমে যাওয়ায় অনেককে ফিরতে হচ্ছে প্রায় খালি হাতে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নদীর বিভিন্ন অংশে অন্তত ১ হাজার ৮৬৯টি বেহুন্দি জাল স্থায়ী খুঁটিতে পাতা রয়েছে। এ ছাড়া বড়ইতলা ফেরিঘাট থেকে লালদিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে আনুমানিক ৩ হাজার খুঁটিজাল রয়েছে। নদী জুড়ে কারেন্ট জালের ব্যবহারও ব্যাপক।
জেলেদের ভাষ্য, বেহুন্দি জালের ফাঁস ঘন হওয়ায় এতে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট মাছ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে। আর কারেন্ট জালেও ধরা পড়ে অপরিণত মাছ। ফলে শুধু ইলিশ নয়, নদীর অন্যান্য দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তারের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির বেতাগী উপজেলা শাখার সভাপতি আব্দুর রবের ভাষায়, বেহুন্দি ও অন্যান্য ক্ষতিকর জালের কারণে বিষখালী নদীর মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়েছে। এতে প্রকৃত জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশের জীবনচক্রে নদী ও সাগরের মধ্যে বিচরণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রজননের উপযোগী পরিবেশের সন্ধানে ইলিশ সাগর থেকে নদীর দিকে আসে। এ সময় নদীর বিভিন্ন স্থানে ঘন জাল পাতা থাকলে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ও অপরিণত জাটকা নির্বিচারে ধরা পড়লে পরবর্তী প্রজন্মের মাছের সংখ্যা কমে যেতে পারে।
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিসুর রহমানের মতে, ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ বেহুন্দি জাল। তার আশঙ্কা, প্রজনন মৌসুমে বিষখালী নদীতে যত্রতত্র এসব জাল পাতা বন্ধ করা না গেলে ইলিশের বংশবিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে। ইলিশের উৎপাদন ধরে রাখতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও মাছের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করা জরুরি— মনে করেন তিনি।
অবৈধ জালের বিস্তারে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছ ধরা জেলেরা। তাদের অভিযোগ, নদীর বিভিন্ন অংশে বাঁশের খুঁটি পোঁতা থাকায় নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় খুঁটিতে আটকে তাদের জাল ছিঁড়ে যায়। মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিনের ভাষ্য, বেহুন্দি জালে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এক শ্রেণির জেলে অবৈধভাবে জাল পাতছেন।
বিষখালী নদীর মৎস্যসম্পদ রক্ষায় বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন স্থানীয় জেলে ও বাসিন্দারা। তাদের মতে, নদীর যেসব স্থানে বেশি জাল পাতা হয়েছে, সেসব জায়গায় নিয়মিত নজরদারি এবং অবৈধ জাল অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে।
একই কথা জানিয়েছেন বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহ. সাদ্দাম হোসেন। তিনি বললেন, ‘বিষখালী নদীতে অবৈধ জাল পেতে ইলিশের প্রজনন বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ নেই। মৎস্যসম্পদ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষায় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। শিগগির ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে নদীকে জালমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’



