হারানো স্বজনের খোঁজে ৫৬ বছর
- বাবুলের স্মৃতিতে শুধু মা-বাবার নাম

ছবি: আগামীর সময়
বয়স তখন চার কি পাঁচ বছর। খেলতে খেলতে রেলস্টেশনে গিয়ে কীভাবে যেন একটি ট্রেনে উঠে পড়েছিলেন ফরিদ মিয়া ওরফে বাবুল মিয়া। ট্রেন চলতে শুরু করার পর বুঝতে পারেন, পরিচিত জায়গা পেছনে পড়ে গেছে। সঙ্গে ছিল না মা-বাবা, জানা ছিল না নিজের গ্রামের নাম কিংবা বাড়ির ঠিকানা। এরপর অপরিচিত দুই ব্যক্তির সঙ্গে চলে যান ঢাকায়। সেই যে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন। এখন মা-বাবার মুখের স্পষ্ট স্মৃতি মনে নেই, গ্রামের নামও ভুলে গেছেন। শুধু মনে আছে দুটি নাম— বাবা মুকাদ্দেস, মা বানেছা।
এই দুটি নামই এখন তার শিকড়ের একমাত্র সূত্র। সে সূত্র ধরে পরিবারের সন্ধান করছেন গাজীপুরের কালীগঞ্জে বসবাসকারী ফরিদ মিয়া ওরফে বাবুল মিয়া। বাবুল এখন কালীগঞ্জ পৌর এলাকার বালীগাঁও গ্রামে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য চালান অটোরিকশা। নিজের সংসার গড়ে উঠলেও হারিয়ে যাওয়া পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার জীবনে এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।
বাবুল মিয়ার ভাষায়, তখন তিনি খুব ছোট। তার মনে আছে, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার মধ্যবর্তী কোনো একটি রেলস্টেশনে খেলছিলেন। খেলতে খেলতেই ভুল করে একটি ট্রেনে উঠে পড়েন। ট্রেন চলতে শুরু করার পর পরিস্থিতি আরও অপরিচিত হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ পর অপরিচিত দুই ব্যক্তি তাকে ঢাকায় নিয়ে যান। তবে ঢাকায় পৌঁছানোর পর ওই ব্যক্তিরাও তাকে রেখে চলে যান। নিজের পরিচয় দেওয়ার মতো বয়স বা জ্ঞান কোনোটিই তখন ছিল না তার। ফলে পরিবারকে খুঁজে পাওয়ার পথও সেখানেই যেন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় এক শিশুর অনিশ্চিত জীবন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর ঢাকার ফুটপাত ও রাস্তাঘাটে কাটিয়েছেন তিনি। কোথা থেকে এসেছেন, তার মা-বাবা কোথায়— এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কোনো তথ্য তার কাছে ছিল না। শুধু বাবা মুকাদ্দেস ও মা বানেছার নামটুকু স্মৃতিতে রয়ে যায়। পরে এক ব্যক্তি তাকে ফরিদপুরে নিয়ে যান। সেখানেই তার শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় কেটে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের নতুন অধ্যায়ও শুরু হয়। ফরিদপুরেই বিয়ে করেন তিনি। পরে জাতীয় পরিচয়পত্রও তৈরি হয় ফরিদপুরের ঠিকানায়।
ফরিদপুরের পর কিছুদিন পটুয়াখালীতেও ছিলেন বাবুল মিয়া। পরে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। সবশেষে ১৫ থেকে ২০ বছর আগে গাজীপুরের কালীগঞ্জে এসে স্থায়ী হন। এরপর থেকে এই এলাকার মানুষই তাকে আপন করে নিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে তিনি ফরিদ মিয়া নামে পরিচিত হলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম বাবুল মিয়া।
পরিচয়ের আরও একটি চিহ্ন রয়েছে তার শরীরে। বাবুল মিয়ার ডান হাতের পিঠে রয়েছে স্পষ্ট সাদা দাগ বা শ্বেতীর চিহ্ন। কালীগঞ্জে চলাফেরার সময় তার সঙ্গে পরিচয় হয় আহসান হাবীব সাজুর। সাজু বর্তমানে কালীগঞ্জ উপজেলা মহিলাবিষয়ক কার্যালয়ে কর্মরত। উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুরের বাসিন্দা হওয়ায় বাবুলের কথাগুলো শুনে তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। এরপর বাবুল মিয়ার পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন সাজু।



