ঐতিহ্যের গৌরীপুর লজ এখন ব্যাংক

গৌরীপুর লজ। ছবি: আগামীর সময়
ময়মনসিংহ নগরীর গৌরীপুর লজ। গৌরীপুরের জমিদাররা এ ভবন তৈরি করেছেন বলেই এ নামকরণ। তবে ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটির হচ্ছে না সংস্কার। অনেক দিন ধরেই সোনালী ব্যাংকের আওতাধীন এটি। সেখানে বসবাস করেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এর ভেতরে ঢুকতে পারেন না সাধারণ কোনো ব্যক্তি। এমনকি ছবি তুলতে গেলেও দেওয়া হয় বাধা। সম্প্রতি এ ভবনটি সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৮৯৭ সালে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পে মহারাজা সূর্যকান্তের দোতলা বাসভবন ‘শশী লজ’ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ময়মনসিংহ শহরে দোতলা পাকা বাড়ি তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়। গৌরীপুরের তৎকালীন জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর তার জামাতার জন্য শহরে একটি বাড়ি করে দিতে চাইলে নিয়মের বেড়াজালে আটকে যায় তার ইচ্ছা। তখন তিনি দোতলা পাকা বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করে কাঠের দোতলা বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং চীন থেকে কারিগর ও বিশেষজ্ঞ আনিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে বিশ্বেশ্বরী দেবী রোডে তৈরি করান এক আকর্ষণীয় কাঠের দোতলা ভবন। এই দোতলা ভবনটিই ‘গৌরীপুর লজ’ নামে পরিচিত। কাঠের এই দোতলা ভবনটির নির্মাণশৈলী ও বিন্যাস অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং দর্শনীয়। ভবনের প্রবেশদ্বারের বাম পাশে নিরাপত্তাগৃহ। পরবর্তী সময়ে এ ভবনটি ময়মনসিংহের সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ব্যাংকের প্রয়োজনে ৮০-এর দশকে মূল বাড়িটির পাশে নির্মাণ করা হয় বিশাল একটি চারতলা ভবন। তবে তত দিনে সৌন্দর্যহানি হয়ে যায় মূল বাড়িটির। বেশ কয়েক বছর আগে বাড়িটির বাইরের অংশে রঙ বার্নিশ করা হলে অনেকটা দূর হয় এর হতশ্রী দশা। তবে সামগ্রিকভাবে গৌরীপুর লজটি দাঁড়িয়ে আছে অযত্ন-অবহেলা এবং অপব্যবহারের অজস্র ক্ষত নিয়ে। বাড়িটিতে বিভিন্ন সরকারের সময় সোনালী ব্যাংকের সরকার সমর্থকরা লম্বা ব্যানার টানিয়ে রাখেন। ফলে দূর থেকে বাড়িটি দেখতে অসুন্দর লাগে। পুরো প্রকৃত অবয়বের চিত্রও ক্যামেরায় ধারণ করা যায় না। এ বাড়িটির ইতিহাস সম্পর্কে নগরবাসী তেমন অবহিতও নন। বাড়ির সামনে নেই কোনো পরিচিতিমূলক তথ্যসহ সাইনবোর্ড। এখনো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত হয়নি বাড়িটি। বাড়িটি সোনালী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। সাধারণ দর্শনার্থীদের এখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
ময়মনসিংহ মহানগর সুজনের সম্পাদক আলী ইউসুফ জানিয়েছেন, তিনি ভবনটির সংরক্ষণ এবং সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি নিয়ে চলতি মাসে দুবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেন। এরপর অনেকেই এ ব্যাপারে তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
এ ব্যাপারে ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ঐতিহ্যবিষয়ক গবেষক স্বপন ধর বলেছেন, ‘এটির সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। চলতি বছর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে ভবনটি পরিদর্শন হয়েছে। এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় নিয়ে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত।’ ভবনটির নির্মাণ সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘চীনা কারিগর আর বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) থেকে কাঠ এনে এ বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। এমনই আরেকটি বাড়ি আছে দার্জিলিংয়ে। গৌরীপুরের জমিদাররাই সেই বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন।’
এ ব্যাপারে ময়মনসিংহের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমীন জানালেন, ভবনটি এখনো গেজেটভুক্ত হয়নি। তবে এসব স্থাপনা নিয়ে জরিপ কার্যক্রম চলছে।




