সম্ভাবনা ছড়াচ্ছে থোকায় থোকায় সবুজ আঙুর
- চাঁদপুরে এক তরুণ উদ্যোক্তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এই আঙুর বাগান

ছবি: আগামীর সময়
বাগানে ঢুকলেই চোখে পড়ে বাঁশের তৈরি মাচার ওপর সারিবদ্ধ লতা। আর তাতে ঝুলছে থোকায় থোকায় সবুজ আঙুর। চাঁদপুরে এক তরুণ উদ্যোক্তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এই আঙুর বাগান, যা বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের ক্ষেত্রে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে কৃষক ও নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার কালিভাংতি এলাকায় ‘প্রধানিয়া এগ্রো’ নামে এই প্রকল্প গড়ে তুলেছেন কামরুজ্জামান প্রধানিয়া।
তবে এই সাফল্যের পথ সহজ ছিল না। শখের বশে শুরু করলেও শুরুতেই তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। মাটির উপযোগিতা, পরিচর্যার জটিলতা— সবই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশি উন্নত জাতের চারা সংগ্রহ করে সেগুলো স্থানীয় পরিবেশে মানিয়ে নেওয়াও ছিল কঠিন কাজ।
কিন্তু হাল ছাড়েননি কামরুজ্জামান। ধৈর্য, পরিশ্রম এবং নিয়মিত গবেষণার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সফলতা অর্জন করেছেন তিনি।
মাত্র ২০ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা এই উদ্যোগ এখন বিস্তৃত হয়েছে বড় পরিসরে। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ হচ্ছে এই উদ্যোক্তার তিনটি প্রজেক্টে। তার সংগ্রহে রয়েছে বিশ্বের ১৮টি দেশের প্রায় ৮৫টি জাতের আঙুর, যা দেশের প্রেক্ষাপটে এক অনন্য উদাহরণ।
বাগানে ফলন ভালো হওয়ায় এরই মধ্যে বাজারজাত করা শুরু করেছেন এই ব্যবসায়ী। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে তার উৎপাদিত আঙুর। প্রতিদিনই চাঁদপুরসহ আশপাশের জেলা থেকে দর্শনার্থী ভিড় করছেন তার বাগানে। কেউ আসছেন ঘুরতে, কেউ শিখতে, আবার নতুন এই উদ্যোগ থেকে অনুপ্রেরণা নিতে আসছেন অনেকেই।
কামরুজ্জামান জানান, করোনাকালে অবসর সময়ে ছাদ বাগান দিয়ে আঙুর চাষ শুরু করেন তিনি। ছাদে ভালো ফলন দেখে মাঠপর্যায়ে প্রথম বাগান গড়ে তোলেন ২০২৪ সালে। পরে ২০২৫ সালে আরও দুটি জমি যুক্ত করে বাণিজ্যিকভাবে চাষ সম্প্রসারণ করেন তিনি।
কামরুজ্জামান আশাবাদ ব্যক্ত করলেন, ‘আমার লক্ষ্য ছিল প্রতি বছর প্রকল্প বাড়ানো। অনেকেই আমাদের কাছ থেকে চারা নিয়ে শুরু করেছেন চাষ। আমি চাই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক আঙুর চাষ।’
নতুন উদ্যোক্তাদের প্রতি তার আহ্বান, বেকার না থেকে যুক্ত হওয়া উচিত আধুনিক কৃষিতে। প্রয়োজন হলে তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে আঙুর চাষ শুরু করা সম্ভব।
উৎপাদন প্রসঙ্গে কামরুজ্জামান জানান, গত বছর একটি প্রকল্প থেকে বিক্রি হয়েছে ৭০-৮০ কেজি আঙুর। চলতি বছর ফলন ভালো হওয়ায় প্রায় ৪০০ কেজি আঙুর বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে শুধু একটি বাগান থেকেই। অন্য দুটি বাগান থেকে উৎপাদন হতে পারে আরও ২০০-৩০০ কেজি আঙুর।
সব মিলিয়ে প্রায় ২০ মণ আঙুর বাজারজাত করার আশা করছেন তিনি। প্রতি কেজি ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করে এ বছর দুই থেকে তিন লাখ টাকা আয় হতে পারে বলে প্রত্যাশা কামরুজ্জামানের।
আঙুর চাষের চ্যালেঞ্জ বিষয়ে কামরুজ্জামান জানান, মিষ্টি জাতের আঙুরে পোকার আক্রমণ হয় বেশি। তাই নিয়মিত পরিচর্যা ও কীটনাশক প্রয়োগ করা জরুরি। এ ছাড়া অতিবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ফলন। এসব থেকে রক্ষা পেতে নিতে হবে পলি ব্যবহারসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা।
চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু তাহের পরামর্শ দিলেন, আঙুর চাষে সফল হতে হলে সঠিক জাত নির্বাচন ও পরিচর্যার বিষয়ে জ্ঞান থাকা জরুরি। আগ্রহীরা কৃষি অফিসের সহায়তা নিলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ভিডিও দেখে এখানে ঘুরতে এসেছেন নাজমুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘ভিডিওতে যা দেখেছি তার চেয়ে বাগানটি বাস্তবে আরও সুন্দর। এখানে এসে মুগ্ধ হয়েছি আমি। এখানকার আঙুর খেয়েছি, খুবই ভালো লেগেছে। ছাদে আঙুর চাষ করার পরিকল্পনা করছি আমিও।’

