এক টাকার সঞ্চয়ে মানবতার সেবায় ‘ভোরের শালিক’

ছবি: আগামীর সময়
মাত্র এক টাকা করে দৈনিক সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু। লক্ষ্য ছিল অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে একটি মানবিক সংগঠনে। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা, গৃহহীনদের আবাসনের ব্যবস্থা, মাদক ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধসহ নানা সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ভোরের শালিক’।
‘মানুষকে নিয়ে মানবতার সেবা’—এই স্লোগানকে ধারণ করে ২০১৩ সালে উপজেলার গাড়াগ্রাম বাজারে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী ইমরান হোসেনের উদ্যোগে মাত্র আটজন সদস্য নিয়ে গড়ে ওঠা সংগঠনটিতে বর্তমানে সদস্যসংখ্যা ২১৬। শুরুতে সদস্যরা প্রতিদিন এক টাকা করে জমা দিয়ে তহবিল গঠন করেন। সেই সামান্য সঞ্চয় থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কার্যক্রম শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটির কার্যক্রম ও পরিধি বিস্তৃত হয়েছে।
শিক্ষা ও চিকিৎসায় সহযোগিতা
সংগঠনটির অন্যতম প্রধান কার্যক্রম দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া। পাশাপাশি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত অসহায় মানুষের চিকিৎসার জন্যও সহযোগিতা করে আসছে সংগঠনটি। এসব সহায়তা পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন উপকারভোগীরা।
সংগঠনটির কাছ থেকে এককালীন আর্থিক সহায়তা পাওয়া একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আকাশ ইসলাম, নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফাত ইসলাম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী জয়া আক্তার বলেন, ‘ভোরের শালিক আমাদের সহযোগিতা না করলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। সংগঠনটির সহযোগিতা আমাদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।’
চিকিৎসাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে সহায়তা পাওয়া ব্যক্তিরাও সংগঠনটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, প্রত্যন্ত এলাকায় অসহায় মানুষের বিপদের সময় এ ধরনের উদ্যোগ আশার আলো দেখায়।
সামাজিক সচেতনতায় নানা উদ্যোগ
শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায়ও কাজ করছে ‘ভোরের শালিক’। অভিভাবক সমাবেশ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন বিষয়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছেন সংগঠনটির সদস্যরা। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও অসহায় মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন তারা।
সংগঠনটির কার্যক্রম বর্তমানে তিনটি শাখায় বিস্তৃত সমাজকল্যাণ, গ্রন্থাগার ও যুবকল্যাণ। এর মধ্যে গ্রন্থাগারটি বইপ্রেমী ও শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গ্রন্থাগারটিতে বিভিন্ন স্বনামধন্য লেখকের এক হাজার ২৮৫টি বই রয়েছে। বই পড়ার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি জ্ঞানচর্চায় তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নৈশ বিদ্যালয় ও সুদমুক্ত ঋণ
অসহায় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চায় সংগঠনটি। বিশেষ করে নৈশ বিদ্যালয় ও বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। পাশাপাশি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য ‘করজে হাসানা’ বা সুদমুক্ত ঋণব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন সংগঠনের সদস্যরা।
তাদের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত মানুষ উপকৃত হবেন এবং আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারগুলো স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবে।
সংগঠনের সভাপতির বক্তব্য
‘ভোরের শালিক’র সভাপতি ইমরান হোসেন বলেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই আমাদের এই সংগঠনের যাত্রা শুরু। আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র শিক্ষার্থী, অসহায় পরিবার ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকতে চাই। মানুষের কল্যাণে আমাদের এ কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।



