একদিকে সংস্কার অন্যদিকে ধস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জোয়ারের সময় কপোতাক্ষ নদের পানি ধীরে ধীরে উঠে আসে। সেই পানিই কয়েকটি পাইপ বেয়ে ঢুকে পড়ে মাছের ঘেরে। বছরের পর বছর ধরে এমন দৃশ্যই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে খুলনার কয়রা উপজেলার নদের তীরবর্তী এলাকায়। এখন পুরনো সেই পাইপগুলোই নতুন এক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে— যে বাঁধ মানুষকে জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার হাত থেকে রক্ষা করার কথা, সেই বাঁধের ভেতরে যদি আগের মতোই পানি চলাচলের পথ খোলা থাকে, তবে সংস্কারের পরও সেটি কতটা টেকসই হবে? কারণ সংস্কারকাজ চলার মধ্যেই ধস নেমেছে বাঁধের দুটি স্থানে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, উপজেলার দশহালিয়া থেকে হোগলা অভিমুখে সংস্কার করা হচ্ছে ২৪০ মিটার বাঁধ। কাজটি বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আমিন অ্যান্ড কোম্পানি। অনুন্নত রাজস্ব খাত (এনডিআর) প্রকল্পের আওতায় ২৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে এ কাজ শুরু হয়েছে ৯ ফেব্রুয়ারি। আগামী ২০ জুলাইয়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা।
তবে ২৪০ মিটার বাঁধের মধ্যে চারটি লবণপানি উত্তোলনের পাইপ এখনো বহাল। প্রায় ১০০ মিটারের মধ্যেই রয়েছে তিনটি পাইপ এবং অন্য অংশে রয়েছে আরও একটি। পাইপ অপসারণ না করেই এগিয়ে নেওয়া হয়েছে বাঁধ সংস্কারকাজ। এরই মধ্যে পাইপসংলগ্ন কয়েকটি স্থানে দেখা দিয়েছে ফাটল। একটি স্থানে ধসে পড়েছে মাটি। সেখানে জিও ব্যাগ ও বাঁশের পাইলিং দিয়ে আপাতত ধস ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধের পাশ থেকেই মাটি কেটে ব্যবহার করা হয়েছে সংস্কারকাজে। এতে নদের চরে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে এবং বাঁধের ঢালও তুলনামূলক খাড়া হয়ে গেছে। ঢাল সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি জিও ব্যাগে পর্যাপ্ত বালুর পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে কাদাযুক্ত মাটি।
স্থানীয় বাসিন্দা রোকন, মোস্তাফিজ, কামালসহ কয়েকজনের ভাষ্য, ওই এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে ৩০-৩৫টি পাইপ। বহু বছর ধরে এসব পাইপের মাধ্যমে নদ থেকে সরাসরি লবণপানি নেওয়া হয় মাছের ঘেরে। জোয়ার-ভাটার সময় পাইপের চারপাশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ধীরে ধীরে মাটি সরে যায় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে বাঁধ।
তাদের দাবি, অতীতেও একই কারণে কয়েক দফা বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। তাই সংস্কারের সময় পাইপ অপসারণ না করলে নতুন করে ঝুঁকি থেকেই যাবে।
পাইপ অপসারণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার দিদারুল ইসলাম। তার ভাষায়, বাঁধের মধ্যে থাকা সব পাইপ অপসারণ করতে হবে। এরপর সঠিকভাবে বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কার করা হলে কাজটি দীর্ঘস্থায়ী হবে। অন্যথায় কয়েক দিনের মধ্যেই আবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বাঁধ। এতে অপচয় হবে সরকারি অর্থ।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা পলাশের দাবি, নিয়ম মেনেই করা হচ্ছে কাজ। পাইপের কারণেই সংস্কারের পর আবার ধস নেমেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে আমাদেরই।
ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ঠিকাদারের মাধ্যমে আবার মেরামত করার কথা জানিয়েছেন কয়রা পানি উন্নয়ন উপবিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী সোলাইমান হোসেন।
অবশ্য পাইপ অপসারণের বিষয়ে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ না নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী। তার মতে, পাইপ অপসারণে রয়েছে কিছু প্রতিবন্ধকতা। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং ঘের মালিকদের নিয়ে বৈঠক করে নেওয়া হবে সিদ্ধান্ত।




