মুক্তাগাছায় পুড়িয়ে হত্যা : ‘আন্দোলনে থাকায় হুমকি পাচ্ছিলেন ফরহাদ’

সাভারে পুলিশ হত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় মানববন্ধনে ছিলেন ফরহাদ (মাইক হাতে), পরদিন নিজ এলাকায় পুড়িয়ে হত্যা করা হয় তাকে (সিসিটিভি ফুটেজ)।
সামাজিক নানা ইস্যুতে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার পরিচিত প্রতিবাদী মুখ ফরহাদ হোসেন জনি (৩৫)। ছিলেন ‘বেকার মুক্তি কর্মসংস্থান’ নামের একটি সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংগঠক ও ময়মনসিংহ শাখার সভাপতি। গত মঙ্গলবারও রাজধানীর প্রেস ক্লাবে একটি মানববন্ধনে দেখা গেছে তাকে।
পরদিন মুক্তাগাছায় নিজ বাড়ির সামনে তার গায়ে পেট্রল ছিটিয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। গতকাল বৃহস্পতিবার হাসপাতালে মারা যান এই যুবক। মৃত্যুর আগে পুলিশকে জানিয়ে যান হামলার কথা। পরিচিতজনরা বলছেন, বেশ কিছুদিন ধরে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল ফরহাদকে, প্রতিবাদী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে বলা হচ্ছিল তাকে।
যেভাবে এই হত্যাকাণ্ড
আগুনের ঘটনাটি বুধবার রাতের। মুক্তাগাছা পৌর শহরের মধ্যহিস্যা এলাকায় ভাড়া বাসার সামনেই ফরহাদের ওপর এই হামলা হয়।
ফরহাদ ওই এলাকার আব্দুস সাত্তারের ছেলে। তিনি সবজি বিক্রি করতেন। পাশাপাশি মধ্যহিস্যা মোড়ে একটি মুদি দোকানও চালাতেন। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে সময়মতো মনোনয়ন ফরম জমা দিতে পারেননি। ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করে এমনটাই জানিয়েছিলেন তিনি।
ফরহাদের স্ত্রী রুনা আক্তারের বর্ণনায়, বুধবার রাতে বাড়ির বারান্দায় বসে ফোনে কথা বলছিলেন ফরহাদ। দুইজন গেটের বাইরে থেকে তাকে ডাকেন। বাইরে যাওয়ার পরপরই তার শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
দগ্ধ অবস্থায় চিৎকার করতে করতে পাশের একটি সেলুনে গিয়ে সাহায্য চান ফরহাদ। সেলুনমালিক চান মোহন বললেন, “আমার সেলুনের সামনে দৌড়ে এসে ‘ভাই আমাকে বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিল ফরহাদ। তখন তার শরীরে কোনো কাপড় ছিল না। সে একটা লুঙ্গি চাচ্ছিল। আমি একটা তোয়ালে দেই। পরে লোকজন এসে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করে।”
সে সময় সেলুন থেকে একটু দূরেই একটি দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন ফরহাদের বাবা সাত্তার। ‘আমি হঠাৎ লোকজনের চিৎকার শুনে গিয়ে ছেলেকে দগ্ধ যাওয়া অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। লোকজনের সহায়তায় তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই। পরে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়’- বলছিলেন সাত্তার।
ময়মনসিংহ মেডিকেলে পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে মৃত্যু হয় এই যুবকের।
ঘটনার সময়ের একটি সিসিটিভি ফুটেজ এসেছে আগামীর সময়ের হাতে। তাতে তার গায়ে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। গায়ের কাপড় খুলে ফেলে তিনি দৌঁড় দেন। একটু সামনে গিয়েই লুটিয়ে পড়েন। পেছনে তার ফেলে আসা কাপড়ে তখনও আগুন জ্বলছিল।
‘আন্দোলনে সরব থাকায় পেতেন হুমকি’
মাদকের বিরুদ্ধে ও বেকারত্ব নিরসনের দাবিতে এলাকায় বেশ সরব ছিলেন ফরহাদ। এসব কারণে কিছুদিন ধরে পাচ্ছিলেন হুমকি-ধমকি, জানান তার বাবা আব্দুস সাত্তার। ‘বেকার মুক্তি কর্মসংস্থানের’ প্রধান মো. হানিফও বলছেন এমন কথা।
‘হানিফ বাংলাদেশি’ নামেই পরিচিত হানিফ। এই নামে ফেসবুকে তার পেজ আছে। সেখানে ফরহাদকে নিয়ে গতকাল বেশ কিছু পোস্ট দেন তিনি। আগামীর সময়কে হানিফ জানালেন, গত মঙ্গলবার রাজধানীর প্রেস ক্লাবের সামনে তারা মানববন্ধন করেছিলেন। সাভারে সম্প্রতি এসবি পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যার বিচার চেয়ে এই কর্মসূচি ডাকা হয়।
মানববন্ধনের ভিডিওতে ফরহাদকে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও এসেছে খবরটি। হানিফ বললেন, এটিই ফরহাদের শেষ প্রতিবাদ। পরের দিনই তাকে হত্যা করা হলো।
মুক্তাগাছায় মাদকের বিরুদ্ধে আগে থেকেই সোচ্চার ছিলেন ফরহাদ। হানিফের সংগঠনে যুুক্ত হয়ে বেকারদের কর্মসংস্থানের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দেন তিনি। এলাকায় গত মাসের একটি মানববন্ধনে ছিল তার সর্বশেষ অংশগ্রহণ। এসব জানালেন হানিফ।
তিনি আগামীর সময়কে বললেন, “ফরহাদ আমাকে ইদানীং বলছিল যে এলাকায় বিভিন্ন হুমকি পাচ্ছে। ‘সরকারবিরোধী কার্যক্রম’ আখ্যা দিয়ে এসব বন্ধ করতে বলা হচ্ছিল তাকে। কারা এসব বলছে, জানতে চাইলে সুনির্দিষ্টভাবে কারও কথা বলেনি। তবে তারা এলাকারই লোকজন। আমার ধারণা, তার প্রতিবাদী আচরণের কারণেই নৃশংসভাবে তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে।”
কিছুদিন আগে এলাকার বাজারে সবজির দোকান দিয়েছিলেন ফরহাদ। হুমকি-ধমকির কারণে সেটিও বন্ধ করতে হয়েছে বলে হানিফকে জানিয়েছিলেন তিনি।
ফরহাদের বাবা আব্দুস সাত্তার বলেছেন, কয়েক মাস আগে মুক্তাগাছা ভূমি অফিস থেকে বস্তাভর্তি কাগজপত্র চুরির ঘটনায় একটি ভিডিও ফেসবুকে দিয়েছিলেন ফরহাদ। চুরির ঘটনায় জড়িত রুবেল ও রফিক নামে দুইজন এখন মাদক মামলায় কারাগারে।
ভূমি অফিসের ঘটনাটির একটি ভিডিও ফেসবুকে পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, কিছু নথি বের করে ফরহাদ বলছিলেন, ‘সাংবাদিক ডেকে দেখাতে হবে, সরকারি অফিসের নথি এসব।’
‘রুবেলের ভাতিজা মোমেন প্রায় ২০ দিন আগে বাসায় এসে ফরহাদকে মারধরের হুমকি দিয়ে যায়। আবার ফরহাদের সঙ্গে পাশের বাসার একজনের মাদকের কোনো ঘটনা নিয়ে বিরোধ ছিল। ওই বাসায় প্রায়ই মাদকের আড্ডা বসত’- বললেন বলছিলেন সাত্তার।
তবে ঠিক কী কারণে ছেলেকে এভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো- তা ধারণা করতে পারছেন না সাত্তার।
পুলিশ যা বলছে
মুক্তাগাছা থানার এসআই নাজমুল হোসেন গতকাল বলেছিলেন, দগ্ধ ও মুমূর্ষু অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে তার সঙ্গে কথা বলেছেন ফরহাদ।
‘তিনি বলছিলেন যে দুজন ব্যক্তি পেছন থেকে তার উপর হামলা করে। একজন গায়ে পেট্রল ঢেলে দেয়, আরেকজন দিয়াশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। কিন্তু সে তাদের চিনতে পারেনি, তাদের মুখে মাস্ক ছিল। কী কারণে এমন হয়েছে, তা-ও সে বলতে পারেনি। এর বেশি আর তার সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না। তার অবস্থা খুব খারাপ ছিল।’
নানা প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণেই এই হামলা কি না- এখনো নিশ্চিত নন থানার ওসি কামরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘মৃত্যুর আগে হাসপাতালে ফরহাদ পুলিশের কাছে ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তবে তিনি হামলাকারীদের নাম-পরিচয় বলতে পারেননি।’
হত্যার কারণ খুঁজতে ও হামলাকারীদের শনাক্তে এরই মধ্যে পুলিশ কাজ শুরু করেছে। ফরহাদের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের পর আজ শুক্রবার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এসব জানিয়েছেন ওসি কামরুল।








