কিশোরগঞ্জের হাওরে নিষিদ্ধ রিং জালের দৌরাত্ম্য

ছবি: আগামীর সময়
কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে নিষিদ্ধ রিং জালের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এক শ্রেণির অসাধু মৎস্য শিকারি অবাধে ব্যবহার করছে এই ভয়ংকর জাল। ফলে দিন দিন মাছশূন্য হয়ে পড়ছে নদ-নদী, খাল-বিল, ডোবা-নালা ও হাওরের বিভিন্ন জলাশয়। শুধু মাছই নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নানা জলজ প্রাণীও এ জালের ফাঁদে পড়ে নিধন হচ্ছে। এতে দেশীয় প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার গুরুই ও ছাতিরচর হাওরে প্রকাশ্যেই চলছে নিষিদ্ধ রিং জালের ব্যবহার। দিনের আলো থেকে রাতের আঁধার, সব সময়ই হাওরের বিভিন্ন স্থানে চোখে পড়ে এই অবৈধ জালের বিস্তার। প্রশাসনের নজর এড়িয়ে, আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই, এক শ্রেণির মৎস্য শিকারি রিং জাল পেতে নির্বিচারে মাছ শিকার করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই জালে একবার মাছ ঢুকলে আর বের হওয়ার সুযোগ থাকে না। শুধু বড় মাছ নয়, মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ এবং বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীও এতে আটকা পড়ে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কমে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছের সংখ্যা, আর ধ্বংসের মুখে পড়ছে হাওরের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য।
হাওরাঞ্চলের মৎস্য শিকারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কম খরচে বেশি মাছ পাওয়ার আশায় অনেকেই রিং জাল ব্যবহারে ঝুঁকছেন। যদিও দীর্ঘমেয়াদে এর ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে অনেকেই সচেতন নন। শুধু হাওরাঞ্চলেই এ বছর কয়েক কোটি টাকার নিষিদ্ধ রিং জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে।
মৎস্য শিকারি বজলু মিয়া জানিয়েছেন, চলতি বছর তিনি ছয়টি রিং জাল ব্যবহার করে মাছ ধরছেন। তার জালে ছিকড়া, গুতুম, লাঠি (টাকি), গুলশাসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে। তিনি বলেছেন, ‘এই জালের ভেতর মাছ ঢুকলে বের হওয়ার ক্ষমতা নাই।’ প্রতিটি জালের দাম ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা।
আরেক মৎস্য শিকারি জাকারিয়া বলেছেন, ‘হাওরে প্রতিবছর মাছ কমে যাচ্ছে। তারপরও আমি প্রতি বছর ম্যাজিক জাল (রিং জাল) দিয়ে মাছ ধরি। সব ধরনের মাছ পাওয়া যায়। এখনও পানি ঠিকমতো আসেনি, তবুও মাছ ধরা শুরু করেছি। একবারে শুকনো মৌসুম পর্যন্ত চলবে।’ তিনি জানিয়েছেন, বর্ষাকালে প্রায় দুই লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেন। এ বছর তিনি ২০টি জাল দিয়ে মাছ ধরছেন। সকালে জাল ফেলে বিকেলে এসে তা তোলেন।
তবে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কৃষক আছমত আলী বলেছেন, ‘ম্যাজিক জালের কারণে কিছুই থাকে না। মাছের ডিম থেকে শুরু করে সবকিছু আটকে যায়। আগে এই হাওর মাছভরা ছিল, এখন মাছই পাওয়া যায় না। আমরা নিষেধ করতে পারি না, নিষেধ করলে মারতে আসে। সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিক, আমরা গরিব মানুষ।’
কিশোরগঞ্জ মৎস্য ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল এস এম আজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, বোরো ধান কাটার পর এবং বর্ষার শুরুতে নতুন পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রজননের উদ্দেশ্যে চলাচল শুরু করে। অসাধু মৎস্য শিকারিরা ঠিক এই সময়টাকেই কাজে লাগিয়ে রিং জাল বসিয়ে মাছ নিধন করছে।
তিনি বলেছেন, ‘অবৈধ রিং জালের ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে দেশীয় প্রজাতির মাছ আরও সংকটে পড়বে। দীর্ঘমেয়াদে পুরো হাওরাঞ্চলের মৎস্যসম্পদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একসময় যারা মাছ শিকার করছেন, তারাও মাছের সংকটে পড়বেন।’ তিনি মৎস্য শিকারিদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রিং জালের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে কিশোরগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, অন্য বছরের তুলনায় চলতি বছর অবৈধ রিং জালের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ আগাম বৃষ্টির ফলে বেরিবাঁধের ভেতরে পানি আটকে থাকা। এতে মাছের অবাধ বিচরণ সম্ভব হচ্ছে এবং শিকারিরা সহজেই মাছ ধরতে পারছে।
তিনি জানান, অবৈধ রিং জালের ব্যবহার রোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। লিফলেট বিতরণ, মাইকিং এবং বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।




