এক প্যাঁচে গারো ঐতিহ্য
আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে দকমান্দা

সংগৃহীত ছবি
গারো ভাষায় ‘দক’ অর্থ শরীর এবং ‘মান্দা’ অর্থ কাপড় বা শাড়ি। গারো নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক দকমান্দা ও দক শাড়ি এক প্যাঁচে পরিধান করা হয়। একসময় সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে কিংবা উৎসবে গারো নারীরা একই রঙের দকমান্দা পরে অংশ নিতেন। এতে যেমন ঐতিহ্য সংরক্ষিত হতো, তেমনি উৎসবের আমেজও বাড়ত।
টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের গায়রা এলাকার গারো কিশোরী বাপ্পি বেডুলকারের কাছে এই দকমান্দা শুধু একটি পোশাক নয়, তার সম্প্রদায়ের পরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। তবে আধুনিকতার প্রভাবে গারোদের ঐতিহ্যবাহী এই পোশাক ও মাতৃভাষা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
সরেজমিনে গায়রা এলাকায় দেখা যায়, মাঠে কাজ করতেও অনেক নারী দকমান্দা ব্যবহার করছেন।
গারো কিশোরী বাপ্পি বেডুলকার বললেন, ‘দকমান্দা আমাদের ঐতিহ্যের পোশাক। এটি এক প্যাঁচে পরতে হয়। ছোটবেলা থেকেই আমি এটি পরে আসছি। দকমান্দা পরতে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু এখন অনেকেই এটি পরতে চান না। বাইরে গেলে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, অনেকে আলাদা চোখে দেখে।’
বাপ্পির ভাষ্য, এই পোশাক শরীরের সঙ্গে এমনভাবে মানিয়ে যায় যে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য লাগে। মনে হয় না শরীরে আলাদা কোনো ভারী পোশাক আছে।
বাপ্পির পরিবারে দুই ভাই ও দুই বোন। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি দামি দকমান্দা পরতে পারেননি। তবে তার স্বপ্ন, বিয়ের দিন সুন্দর একটি দকমান্দা পরে বিয়ের আসরে বসবেন।
গারো সম্প্রদায়ের সদস্য অঞ্জনা নকরেক বলছিলেন, দকমান্দার নকশা ও রঙে পাহাড়ি প্রকৃতি এবং গারো সংস্কৃতির ছাপ ফুটে ওঠে।
মধুপুরের অনেক পরিবার এখনো নিজেদের ব্যবহারের জন্য দকমান্দা বুনে থাকে। বাজারে দক শাড়ি ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা এবং উন্নত মানের দকমান্দা ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
আচিক মিচিক সোসাইটির পরিচালক সুলেখা ম্রং জানান, গারো সমাজে দকমান্দা শুধু পোশাক নয়, এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম বাহক। তবে সময়ের পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের কারণে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এবং মূলধারার সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ব্যবহার কমছে।
তবু বাপ্পির মতো অনেক তরুণ-তরুণী বিশ্বাস করেন, ভাষা ও পোশাকই গারো সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাই দকমান্দা টিকিয়ে রাখা মানে নিজেদের শিকড় ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা।




