সাগরে জেলেদের ভরসা জেলেরাই, প্রশাসনের উদ্ধার অভিযান নিয়ে প্রশ্ন

সংগৃহীত ছবি
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে কোনো ট্রলার বিপদে পড়লে জেলেদের প্রথম ভরসা হয়ে ওঠে কাছাকাছি থাকা অন্য মাছ ধরার ট্রলার। কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় উদ্ধারে অংশ নিতে পারে না সরকারি সংস্থাগুলো। আবার অনেক সময় উদ্ধারকারী নৌযানগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কেটে যায় দীর্ঘ সময়।
সম্প্রতি বরগুনার পাথরঘাটার ‘এফবি বরকত’ নামের একটি ট্রলারডুবির ঘটনা আবারও গভীর সমুদ্রে জেলেদের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় উদ্ধারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।
গত ২৪ আগস্ট দুপুরে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পাথরঘাটা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যায় ‘এফবি বরকত’। ট্রলারটিতে ছিলেন ১৩জন জেলে। দুর্ঘটনার পর কাছাকাছি থাকা আরেকটি মাছ ধরার ট্রলারের জেলেরা সাগরে ভাসমান অবস্থায় আটজনকে জীবিত উদ্ধার করেন। ঘটনায় নিখোঁজ হন পাঁচজন।
নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে সরকারি কোনো নৌযান ঘটনাস্থলে না থাকায় বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির উদ্যোগে দুটি মাছ ধরার ট্রলার সমুদ্রে পাঠানো হয়। প্রায় ১৩ ঘণ্টা সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। এ সময় একজন জেলের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। সাগর উত্তাল থাকায় ডুবে যাওয়া ট্রলারের কেবিনে প্রবেশ করতে পারেননি উদ্ধারকর্মীরা। এই ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন চার জেলে।
দুর্ঘটনার ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও ডুবে যাওয়া ট্রলারটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সমুদ্র উত্তাল থাকায় বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অভিযান। যে ট্রলারগুলো দিয়ে উদ্ধারকাজ চলছে, সেগুলো মূলত মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত। গভীর সমুদ্রে এমন ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানের জন্য এসব ট্রলারের সক্ষমতাও সীমিত।
নিখোঁজ চার জেলের স্বজনদের চাওয়া- যদি ট্রলারের কেবিনের ভেতরে কেউ আটকা পড়ে থাকেন, দ্রুত তাকে উদ্ধার করা হোক।
নিখোঁজ নুর আলম মোল্লার বাবা জাহাঙ্গীর মোল্লা আগামীর সময়কে বলেন, ‘আমার বড় ছেলে সাগরে ট্রলার ডুবিতে নিখোঁজ রয়েছে। ধারণা করছি, সে ট্রলারের কেবিনে আটকা পড়ে মারা গেছে। যারা উদ্ধার করতে গেছে, তাদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি কেবিনটি এখনো অক্ষত আছে। সরকারের কাছে দাবি, নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠিয়ে আমার ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে আমাদের কাছে দেওয়া হোক।’
বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবি ও জেলে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। বৈরী আবহাওয়া, ঘূর্ণিঝড় ও উত্তাল ঢেউয়ের কারণে প্রতিবছরই অনেক জেলে দুর্ঘটনার মুখে পড়েন। কিন্তু গভীর সমুদ্রে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত বিশেষায়িত ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাথরঘাটার জেলেরা জানিয়েছেন, তারা সমুদ্রে বিপদে পড়লে প্রথমে সাহায্যে এগিয়ে আসেন অন্য জেলেরা। ট্রলার মালিক সমিতিও অনেক সময় নিজেদের অর্থে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু মাছ ধরার ট্রলার দিয়ে গভীর সমুদ্রে উদ্ধারকাজ চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একটি দুর্ঘটনাগ্রস্ত ট্রলার উদ্ধারে গিয়ে আরেকটি ট্রলারও দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে।
উপকূলীয় জেলেদের সুরক্ষায় পাথরঘাটায় নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ড স্টেশন রয়েছে। কিন্তু বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরে জেলেদের কোনো বিপদ হলে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করার জন্য বড় নৌযান ও প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম নেই তাদের। তাই গভীর সমুদ্রে গিয়ে নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে কার্যকর অভিযান চালাতে পারছেন না তারা।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতির বড় একটি অংশ জেলেদের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জীবন রক্ষায় বঙ্গোপসাগরে আধুনিক ও বিশেষায়িত উদ্ধারকারী নৌযান মোতায়েন করা প্রয়োজন।’
তিনি আরো বলেন, ‘এফবি বরকত উদ্ধারে সমিতির পক্ষ থেকে দুটি মাছ ধরার ট্রলার পাঠানো হয়েছে। কয়েক দিন ধরে চেষ্টা করেও উত্তাল সাগরে তারা ট্রলারের কাছে যেতে পারছেন না। নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে দ্রুত নৌবাহিনীর জাহাজসহ সরকারি উদ্ধারকারী নৌযান পাঠানোর দাবি করছি।’
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বরগুনার বিপুলসংখ্যক জেলে গভীর সাগরে মাছ শিকার করেন। দুর্ঘটনার পর দ্রুত তাদের উদ্ধারে জেলায় একটি আধুনিক উদ্ধারকারী নৌযান থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে নৌবাহিনীর সহযোগিতা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বরগুনা জেলা প্রশাসক তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘এটি খুবই দুঃখজনক বিষয়। কোস্টগার্ড সব সময় কেন উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করতে পারে না, সে বিষয়ে শুধু অভিযোগ করে লাভ নেই। বিষয়টি নিয়ে আবারও কোস্টগার্ডের সঙ্গে কথা বলব।’
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের তালিকা তৈরির জন্য জেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।’







