খরতাপে পুড়ছে রংপুর
কাজ নেই, চরের মানুষের ঘরে হাহাকার

ছবি: আগামীর সময়
বোরো ধানের কাটা-মাড়াই শেষ হয়েছে কিছুদিন আগেই। আমন ধানের চারা রোপণ শুরু হতে এখনো বেশ খানিকটা সময় বাকি। রংপুর অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এখন অলস পড়ে আছে। বছরের এই সময়টাতে কৃষি শ্রমিকদের হাতে তেমন কোনো কাজ থাকে না। তাই পেটের তাগিদে অনেকেই দল বেঁধে ছোটেন ঢাকা বা দেশের অন্য কোনো প্রান্তে। আর যারা এলাকায় থেকে যান, তাদের ভরসা দু-একদিন পর পর আমন ক্ষেতের নিড়ানি বা পরিচর্যার কাজ। দিন শেষে জোটে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি। তা দিয়েই কোনো রকমে টানে সংসারের চাকা।
তবে এবার সেই যৎসামান্য রোজগারের পথটুকুও কেড়ে নিয়েছে প্রকৃতি। গত কয়েকদিন ধরে চলা তীব্র রোদ আর তীব্র তাপপ্রবাহে স্থবির হয়ে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষের জীবন। মাঠে দাঁড়ানোর উপায় নেই। ফলে কাজ হারিয়ে খেয়ে না-খেয়ে চরম কষ্টে দিন কাটছে এই অঞ্চলের লাখো শ্রমিকের। সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন তিস্তার চরের বাসিন্দারা।
রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেল এক চাতক চিত্র। প্রখর খরতাপে যেন পুড়ছে গোটা অঞ্চল। রাস্তাঘাটে চেনা কোলাহল নেই। তীব্র গরমে মানুষজন দূর-দূরান্তের গাছের ছায়ায় বসে ক্লান্তি জুড়াচ্ছেন। নগরীর চব্বিশ হাজারী এলাকায় প্রচণ্ড রোদের কারণে কাজ ফেলে ক্ষেত থেকে উঠে আসছিলেন পঞ্চাশোর্ধ কৃষি শ্রমিক তারেক আলী। শরীর বেয়ে ঝরছিল ঘাম। কণ্ঠে ক্লান্তি আর হাহাকার নিয়ে তিনি বলেন, “মন্নের (মরণের) গরমে মরি গেইনো বাহে। চনচনা অইদোত (কড়া রোদে) হামার গাওত ফোসকা পড়ি গেইচে। ইয়াতে কী আর কাম করা যায়!”
একই অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন আরেক কৃষি শ্রমিক অহেদ আলী। তিনি বাস্তবতার কঠিন সমীকরণ তুলে ধরে জানালেন, 'কাম না করলে হামার পেটোত ভাত চইরবার নয়, না খ্যায়া থাকা নাগবে। ফির এমন অইদ আর গরমে কাম করলে হামার জীবনে বাইচপার নয়।' অন্যদিকে তিস্তায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন আহাম্মদ আলী। বুধবার দুপুরে গঙ্গাচড়ার বাগডোহরা চরে প্রখর রোদের মধ্যেই মাথার ওপর একটা ছাতা টাঙিয়ে নিজের দুপুরের খাবার রান্না করছিলেন তিনি। ঘর্মাক্ত শরীরে আহাম্মদ আলী বললেন, 'কী আর করি বাহে—এ্যাকনা কিছু পেটোত দিয়া বাঁচা তো নাগবে! এই চরোত একনা গাছের ছায়াও নাই।'
রংপুর জেলায় কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। বিশেষ করে তিস্তার চরাঞ্চলসহ গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও তারাগঞ্জ এলাকার শ্রমজীবীদের জীবনযুদ্ধ এই সময়ে আরও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিদিন সকাল হতেই তারা দল বেঁধে কাজের খোঁজে শহরের দিকে ছোটেন। প্রত্যেকের বাইসাইকেলের পেছনে বাঁধা থাকে ডালি, কাস্তে, কোদাল, দা কিংবা খন্তার মতো চেনা সব উপকরণ। শহরের শিমুলবাগ, জামতলা মোড়, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, বেতপ্টি কিংবা রেলওয়ে স্টেশনের ‘শ্রমিকের হাট’-এ গিয়ে প্রতিদিন জড়ো হন তারা।
কেউ বাসাবাড়ির মাটি কাটা, বালু ফেলা কিংবা ঘরের খুঁটি লাগানোর কাজের জন্য চুক্তিতে বা দৈনিক মজুরিতে বিক্রি হন। কাজ মিললে মুখে হাসি ফোটে, আর না মিললে শূন্য হাতে বাড়ি ফেরা ছাড়া উপায় থাকে না। শিমুলবাগে কাজের আশায় বসে থাকা গঙ্গাচড়ার গজঘণ্টা ইউনিয়নের আজিজুল ইসলামের ভাষ্য, 'কাজ জুটলে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা হাজিরা পাওয়া যায়। কিন্তু কয়েকদিন ধরে এই গরমে কেউ কাজে ডাকছে না। বিকেল পর্যন্ত দেখে হয়তো খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হবে।'
শহরের চিত্রও আলাদা কিছু নয়। দুপুরে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত রিকশাচালকদের লাইন ধরে গাছতলায় বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে। রিকশাচালক হেলাল উদ্দিন কষ্ট, 'এতো রইদোত (রোদে) রিকশা চলে কাহিল হয়্যা গেইনো বাহে। হামার ভালো একটেও নাই।'
এমন বৈরী আবহাওয়ায় কেবল উপার্জনে টান পড়েনি, বাড়ছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিও। চিকিৎসকরা বলছেন, এই গরমে হিটস্ট্রোক, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ার আশঙ্কা থাকে। রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা জানান, বর্তমানে এ অঞ্চলে যে আবহাওয়া বিরাজ করছে, তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। এতে শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম ঝরে মানুষ দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অবস্থা থেকে রক্ষায় তিনি সবাইকে বেশি করে পানি পান করার এবং প্রয়োজন ছাড়া রোদে না বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, কয়েকদিন ধরে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে। বুধবার বিভাগের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দিনাজপুরে—৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তীব্র তাপপ্রবাহ আরও কয়েকদিন বজায় থাকতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ আর কাজের তীব্র সংকট— দুইয়ে মিলে রংপুরের শ্রমজীবী মানুষের ঘরে ঘরে এখন কেবলই টিকে থাকার লড়াই।




