বিশ্বকাপ ঘিরে নেত্রকোনায় নেই আগের সেই উন্মাদনা

জেলা শহরের প্রধান সড়কে দেখা যাচ্ছে না কোনো ফুটবল দলের পতাকা
একসময় ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই ছিল নেত্রকোনাজুড়ে উৎসবের আমেজ। শহর থেকে গ্রাম, চায়ের দোকান থেকে স্কুল মাঠ, হাট-বাজার থেকে পাড়া-মহল্লা, সব জায়গায় চলত ফুটবল নিয়ে আলোচনা, আর আবেগের লড়াই। আর্জেন্টিনা না ব্রাজিল, জার্মানি না ইতালি, ফ্রান্স না স্পেন, কোন দল সেরা, কোন খেলোয়াড় ইতিহাসের মহানায়ক, এসব নিয়ে রাতভর চলত সমর্থকদের প্রাণবন্ত বিতর্ক।
সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই যেন স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে।
একসময় বিশ্বকাপের মৌসুম এলেই নেত্রকোনার আকাশ ঢেকে যেত বিভিন্ন দেশের পতাকায়। বাড়ির ছাদ, দোকানের সামনে, রিকশা, মোটরসাইকেল, এমনকি গ্রামের বাঁশঝাড়েও উড়তে দেখা যেত প্রিয় দলের পতাকা। রাত গভীর হলেও হাজারো মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে খেলা দেখতেন। প্রিয় দলের গোল হলে আনন্দধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা। এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় ভেসে যেত উল্লাসের শব্দ।
এবার বিশ্বকাপ ঘিরে নেত্রকোনা শহর কিংবা গ্রামে আগের মতো উন্মাদনা চোখে পড়েনি। শহরের প্রধান সড়ক, অলিগলি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নেই রঙিন পতাকার সারি। বাড়ির ছাদে দেখা যাচ্ছে না বিশাল ব্যানার কিংবা প্রিয় দলের সমর্থনে আলোকসজ্জা। বিশ্বকাপের মৌসুম হলেও অনেক এলাকায় বোঝার উপায় নেই যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসর সামনে।
সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এ চিত্র। তরুণদের বড় একটি অংশ এখন ব্যস্ত স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদনে। ফলে মাঠের খেলা কিংবা বিশ্বকাপ ঘিরে সামাজিক উৎসবের সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।
শহরের প্রবীণ বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্তও নেত্রকোনায় ফুটবল নিয়ে ব্যাপক উন্মাদনা দেখা যেত। বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত পতাকা তৈরি ও বিক্রির ধুম। দর্জিদের দোকানে রাত জেগে চলত সেলাইয়ের কাজ। বড় বড় পতাকার অর্ডার সামলাতে হিমশিম খেতে হতো কারিগরদের।
তবে এখন অনেকেই মনে করছেন, মাদকের বিস্তার, মাঠের সংকট এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে কিশোর-যুবকদের একটি অংশ খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
নেত্রকোনা শহরের প্রবীণ ফুটবলপ্রেমী আসাদুজ্জামান আঙ্গুর বলেছেন, ‘একসময় বিশ্বকাপ এলেই মনে হতো ঈদের মতো উৎসব শুরু হয়েছে। সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানে বসে সবাই ফুটবল নিয়ে আলোচনা করত। ছোট-বড় সবাই প্রিয় দলের জার্সি কিনত। এখন সেই পরিবেশ আর নেই। মানুষ ধীরে ধীরে খেলা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।’
শহরের কয়েকজন ক্রীড়া সামগ্রী ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, আগে বিশ্বকাপ এলেই জার্সি, পতাকা, হেডব্যান্ড, ক্যাপসহ বিভিন্ন সামগ্রীর বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যেত। অনেক দোকানে অতিরিক্ত কর্মচারী পর্যন্ত রাখতে হতো। কিন্তু এখন বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কম।
একজন ব্যবসায়ী বলেছেন, ‘আগে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির জন্য ক্রেতাদের ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে যেত। এখন বিশ্বকাপ সামনে থাকলেও তেমন ক্রেতা নেই।’
একই চিত্র দেখা গেছে শহরের দর্জি দোকানগুলোতেও। একসময় বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দিনরাত পতাকা তৈরির কাজ চললেও এখন অর্ডার খুবই সীমিত।
ক্রীড়া সংগঠকদের মতে, এ পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। জেলার অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মাদকের সহজলভ্যতা, খেলাধুলার মাঠ কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা মানুষের আগ্রহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
নেত্রকোনা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য প্রীতম সোহাগ বলেছেন, ‘আমরা ছোটবেলায় বিকেলে মাঠে না গেলে দিনই পূর্ণ হতো না। এখন অনেক শিশু-কিশোর মাঠের চেয়ে মোবাইল ফোনেই বেশি সময় কাটায়। ফলে খেলাধুলার প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণ কমে যাচ্ছে।’
স্থানীয় ফুটবল সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে বিশ্বকাপ উপলক্ষে পাড়া-মহল্লায় বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হতো। ম্যাচ ঘিরে থাকত বিশেষ প্রস্তুতি। এখন এমন আয়োজনও অনেক কমে গেছে।’
তরুণ সমর্থক পারভেজ ইমরান বলেছেন, ‘এখন সবাই মোবাইলে খেলা দেখে। একসঙ্গে বসে খেলা দেখার যে আনন্দ ছিল, সেটা কমে গেছে।’
তবে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি বলে মনে করেন ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিশ্বকাপ এলে এখনো মানুষ খোঁজখবর রাখেন, প্রিয় দলের খেলা দেখেন এবং সামাজিক মাধ্যমে মতামত জানান। তবে প্রকাশ্য উৎসবমুখর পরিবেশ আগের তুলনায় অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে।
অনেকেই মনে করেন, নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলার সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে না পারলে ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্য আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। এজন্য স্কুল পর্যায়ে খেলাধুলা বাড়ানো, পর্যাপ্ত মাঠ সংরক্ষণ, স্থানীয় প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং শিশু-কিশোরদের মাঠমুখী করার উদ্যোগ জরুরি।






