পশুর হাটে ‘অনিয়ম’
খাস আদায় ৪০ লাখ, কোষাগারে ১৫ লাখ

নেত্রকোনার বারহাট্টার নৈহাটি গরুর হাট। ছবি: আগামীর সময়
ঈদুল আজহা উপলক্ষে গরুর হাটে ব্যাপক বেচাকেনা। খাস আদায়ে ব্যস্ত স্থানীয় বিএনপি নেতারা। হাট শেষে হিসাবে আদায় হলো ৪০ লাখ টাকা। সরকারি কোষাগার পেল কেবল ১৫ লাখ। এ হিসাব খোদ খাস আদায় করা নেতার। তবে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দেওয়া হিসাব একেবারেই ভিন্ন। তার দাবি, ১৫ লাখ হলো আদায়ের পরিমাণ। বাকি টাকার নেই হদিস।
এ ঘটনা নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় প্রতি সোমবার বসা নৈহাটি গরুর হাটের। হাট সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গুরুতর অনিয়ম হয়েছে এবার। খাস আদায়ের কাজ প্রশাসনের হলেও ইউএনও ও এসিল্যান্ডের সহযোগিতায় এ কাজে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিক আহমেদ কমল, জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি রহমত আলী, সহ-সভাপতি মানিক আজাদ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল্লাহ সোহেল।
খাস আদায়ের পুরো টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে পকেটে পুরেছেন এই নেতারা- অভিযোগ হাট সংশ্লিষ্টদের। অভিযোগকারীরা নিরাপত্তার শঙ্কায় নাম প্রকাশে রাজি হননি।
তারা জানালেন, ঈদ ঘিরে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও পাশের এলাকা থেকে হাজার হাজার গরু ও অন্যান্য পশু আনা হয়েছে নৈহাটি গরুর হাটে। জমেছে বেচাকেনাও। হাটের প্রবেশ ফি, ইজারা, খাস আদায় এবং বিভিন্ন খাত থেকে সংগ্রহ হয়েছে ৪০ লাখ টাকা। তবে সরকারি হিসাবপত্রে মাত্র ১৫ লাখ টাকা জমা দেখানো হয়েছে।
এই হিসাব দিয়েছেন উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি রহমত আলীও। ‘ঈদের আগে শেষ হাটবাজার ছিল সোমবার। হাটের টাকা কালেকশনে ব্যাপক খরচ। ৫৫ জন ভলান্টিয়ার হাটে কাজ করে। সেদিন মোট ৪০ লাখ টাকা খাস আদায় করা হয়েছে।’
এই অর্থ খরচের হিসাব জানতে চাইলে তার দাবি, ‘সরকারি কোষাগারে ১৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা হাট পরিচালনা ব্যয়ের জন্য রাখা হয়েছে। কোনো টাকা আত্মসাৎ হয়নি। এটা মিথ্যাচার।’
উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মানিক আজাদ এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নাকচ করেছেন। বলেছেন, ‘আমি নির্বাচনমুখী মানুষ। হাটে কত টাকা উত্তোলন হয়েছে বা তা দিয়ে কী করা হয়েছে- আমি জানি না।’
বক্তব্যের জন্য কল করা হয় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিক আহমেদ কমলের মোবাইল ফোনে। রিং বাজলেও তা কেটে দেওয়া হয়। পরে ওই নম্বরে আর সংযোগ পাওয়া যায়নি। ফোনে পাওয়া যায়নি যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আরিফুল্লাহ সোহেলকেও।
এলাকার বাজার কমিটির সদস্য সচিব হলেন বারহাট্টা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)- এসিল্যান্ড মো. সাজেদুল ইসলাম। তার দেওয়া তথ্য- ঈদের আগে সোমবার ১৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে ওই হাট থেকে। এর মধ্যে ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে পাশের একটি মাদ্রাসায়।
‘এর বাইরে কোনো টাকা তোলার বিষয়ে আমার জানা নেই’- দাবি তার। প্রশাসনের বদলে বিএনপি নেতারা কেন খাস আদায়ে নেমেছিলেন- এ প্রশ্নে এসিল্যান্ডের জবাব, ‘হাটের জন্য লোকবল কম ছিল। তাই বিএনপি নেতাকর্মীদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল।’
বিএনপি নেতার হিসাবে হাট থেকে আদায়ের পরিমাণ ৪০ লাখ টাকা- এ কথা বলার পর এসিল্যান্ডের দাবি, ‘আপনারা যা-ই বলেন না কেন, আমি যা জানি তা-ই বললাম। এর বাইরে কিছু জানি না। কোষাগারে কত গেল, বাকি হিসাব জানতে আপনারা ইউএনও আর ডিসি স্যারের সঙ্গে কথা বলেন।’
হাটের রাজস্ব আদায় ও সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়ে ওঠা অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে বলে জানালেন ইউএনও সেলিনা রহমান। ‘কোনো ধরনের অনিয়ম বা আর্থিক গরমিলের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি ছুটিতে আছি। এসে এই বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের কাছেও জানতে চাওয়া হয় বিষয়টি। ‘ইউএনও বিষয়টি দেখভাল করবে, তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন’- বলে ফোন কেটে দেন তিনি।
বিষয়টি কেবল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নয়, এটি সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিরও প্রশ্ন- এমন অভিমত হাট সংশ্লিষ্টদের। তাদের কথা, হাটের অর্থ জনগণের সম্পদ। সেই অর্থ যথাযথভাবে সরকারি খাতে জমা হওয়া প্রয়োজন। তা নাহলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জনমনে তৈরি হয় আস্থার সংকট।




