কয়রায় ৫ কোটির সেতু নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ

ধূসর বর্ণের নিম্নমানের পাথর (বাঁয়ে), ভালো মানের কালো পাথর (ডানে)
খুলনার কয়রায় প্রায় ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুতে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। পিলার ঢালাইয়ে কাঁদাযুক্ত ও ভাঙাচোরা পাথর ব্যবহার, রডের পরিমাণে অনিয়ম এবং বালু-সিমেন্টের অনুপাত ঠিক না রাখার অভিযোগে স্থানীয়দের তীব্র ক্ষোভের পর কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরে মানসম্মত পাথর এনে আবার কাজ শুরু করা হলেও আগের নিম্নমানের সামগ্রী অপসারণ না করায় সেতুটির স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনগুরুত্বপূর্ণ এ সেতুর নির্মাণে শুরু থেকেই অনিয়ম চলছে। ঢালাইয়ে নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করা হয়েছে, যা সামান্য আঘাতেই গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। ইটের আঘাতে পাথর ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি হাতের চাপে ভেঙে পড়ার ঘটনাও দেখা গেছে। একই সঙ্গে কাঁদাযুক্ত পাথর পরিষ্কার না করেই ঢালাইয়ে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। তাদের দাবি, রডের ব্যবহারও নকশা অনুযায়ী হয়নি।
গত ৩ জুন (বুধবার) স্থানীয়রা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিম্নমানের পাথর ব্যবহারের ভিডিও ছড়িয়ে দিলে বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের অবগত করা হলে কয়রা উপজেলা প্রকৌশল দপ্তর ও এলজিইডি কর্মকর্তারা কাজ বন্ধ করেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, একটি পাথরের ওপর ইট দিয়ে আঘাত করলে তা সহজেই গুঁড়ো হয়ে যায়। কিছু পাথর হাতেই ভেঙে পড়ছে এবং ভেতর থেকে কাঁদা বেরিয়ে আসছে। এক ব্যক্তি সেখানে প্রশ্ন করেন, ‘সামান্য আঘাতে পাথর গুড়োগুড়ো হয়ে যাচ্ছে, ওটা পাথর নাকি অন্য কিছু?’ আরেকজনকে হাত দিয়ে পাথর ভেঙে কাঁদা বের করতে দেখা যায়।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কাজ বন্ধের পর আবার মানসম্মত পাথর এনে কাজ শুরু হয়েছে। নির্মাণস্থলের এক পাশে ধূসর রঙের বিতর্কিত পাথরের স্তুপ পড়ে আছে, আরেক পাশে রাখা হয়েছে নতুন কালো রঙের পাথর। শ্রমিকরা নতুন পাথর দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে পুরনো পাথর সরানো হয়নি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পুরনো পাথর ভবিষ্যতে আবার ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় তথ্যফলকও দেখা যায়নি।
উপ-সহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন বলেছেন, ‘স্থানীয়দের বাধার মুখে বিতর্কিত পাথর দিয়ে কাজ বন্ধ করা হয়। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাতে মানসম্মত পাথর আনে এবং সেই পাথর দিয়েই কাজ চলছে।’
তিনি আরও জানালেন, কাজের তথ্যসংবলিত ব্যানার ছিল, তবে তা নষ্ট হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নকশা অনুযায়ী রড ব্যবহার করা হয়নি এবং কাজের অগ্রগতিও অত্যন্ত ধীর। বর্ধিত সময়সীমা শেষ হতে আর মাত্র ২৫ দিন বাকি থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
এ প্রকল্পটি কয়রার মহারাজপুর সেতু, যা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন (কেবিএস) প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হচ্ছে। ২০২২ সালের ৩ আগস্ট কার্যাদেশ দেওয়া হয়। যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএ-জেডটি জেভি কাজটি বাস্তবায়ন করছে। সেতুটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ কোটি ৭১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭২ টাকা। ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময়মতো শেষ হয়নি। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বললেন, ‘শুধু পাথর পরিবর্তন করলেই দায় শেষ হবে না। কীভাবে নিম্নমানের সামগ্রী নির্মাণস্থলে পৌঁছালো এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে আগের নিম্নমানের ঢালাই তুলে ফেলে ভালো মানের সামগ্রী দিয়ে নতুন করে সেতুর কাজ শেষ করতে হবে।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার সাইফুল ইসলামের মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। ঠিকাদার জিয়াউর রহমান টিটোর ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
কয়রা উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী দপ্তরের কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. শাফিন শোয়েব বলেছেন, ‘অভিযোগের পর কাজ বন্ধ করা হয়েছে। পরে মানসম্মত পাথর এনে আবার কাজ শুরু হয়েছে।’
তিনি জানিয়েছেন, নিম্নমানের পাথর সরিয়ে ফেলা হবে এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এলজিইডি সতর্ক রয়েছে।





