ছয় বছরেও শেষ হয়নি সেতু, ভরসা সেই ট্রলার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজবাড়ীর পাংশায় গড়াই নদীর ওপর সেতু নির্মাণের অপেক্ষায় দুই পাড়ের মানুষের কেটেছে ছয়টি বছর। ৬৫০ মিটার দীর্ঘ সেতুর কাজ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। নির্ধারিত ৩৬ মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময় পেরিয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এখনো বসানো হয়নি একাধিক স্প্যান, তৈরি হয়নি সংযোগ সড়ক। জমি অধিগ্রহণের জটিলতা ও নির্মাণকাজের ধীরগতিতে থমকে আছে প্রকল্প। ফলে নদী পারাপারে এখনো ভরসা সেই ট্রলার। বর্ষায় স্রোত বাড়লে ঝুঁকি নিয়েই পার হতে হয় মানুষ ও যানবাহন।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, সেতুটি চালু হলে রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, পাবনাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে। রাজবাড়ীর সঙ্গে ঝিনাইদহ ও মাগুরার দূরত্ব কমবে প্রায় ৫০-৬০ কিলোমিটার।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য বলছে, ‘পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় পাংশা উপজেলা সদর থেকে মাগুরার লাঙ্গলবাঁধ জিসি সড়ক পর্যন্ত গড়াই নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ কোটি ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ১৭০ টাকা। যৌথভাবে নির্মাণকাজ করছে এম এম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড ও মীর হাবিবুল আলম। ২০২০ সালের ৩ জুন শুরু হওয়া কাজটি ৩৬ মাসের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। পরে দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। দ্বিতীয় দফায় বাড়ানো মেয়াদ চলতি বছরের ১০ অক্টোবর শেষ হয়েছে। তবে কাজ শেষ করতে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে এলজিইডি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এ পর্যন্ত সেতুর প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য ৬ দশমিক ৩৬৫ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন। এর মধ্যে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় ৩ দশমিক ৬৬৫ একর, ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ২ দশমিক ৫২ একর এবং মাগুরার শ্রীপুরে শূন্য দশমিক ১৮ একর জমি রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনেও জমি অধিগ্রহণ শেষ না হওয়ায় রাজবাড়ী অংশে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা যাচ্ছে না। এতে সেতুর কাজ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে জটিলতা।
সরেজমিন দেখা গেছে, পাংশার কসবামাজাইল ইউনিয়নের নাদুরিয়া ঘাটের বিপরীতে নদীর ওপারে মাগুরার লাঙ্গলবাঁধ হাট। নদীর দুই পাড়কে যুক্ত করতেই চলছে সেতুর নির্মাণকাজ। নাদুরিয়া বাজার থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দক্ষিণে সেতুটির প্রথম খুঁটি। সেতুর একটি অংশ রমজান নামে এক ব্যক্তির বাড়ির ওপর দিয়েও নির্মিত হয়েছে। রাজবাড়ী অংশে সেতুর পাশে নির্মাণসামগ্রী তেমন দেখা যায়নি। তবে সেতুর ওপর কয়েকজন শ্রমিককে কাজ করতে দেখা গেছে। মূল নদীর ওপর একটি পিলার ছাড়া অন্য পিলারগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। ১৩টি স্প্যানের মধ্যে মূল নদীতে রয়েছে ছয়টি। এর চারটি এখনো বসানো হয়নি। অন্যদিকে ঝিনাইদহ অংশে সংযোগ সড়কের কাজ চলছে।
সেতু চালু না হওয়ায় নাদুরিয়া ঘাট দিয়ে ট্রলারে নদী পার হতে হচ্ছে স্থানীয়দের। বর্ষায় গড়াই নদীতে স্রোত বাড়লে ঝুঁকি আরও বাড়ে। যাত্রীদের পাশাপাশি মোটরসাইকেল, ইজিবাইক ও পণ্যবোঝাই ভ্যানও ট্রলারে পারাপার করা হয়। এতে সময় ও খরচ দুটিই বাড়ছে।
নাদুরিয়া এলাকার বাসিন্দা সেলিম মিয়ার ভাষায়, সেতুর কাজ শুরুর পর থেকেই শুনছেন, এবার নদী পারাপারের কষ্ট শেষ হবে। কিন্তু বছর যায়, কাজ শেষ হয় না। বর্ষায় স্রোত বাড়লে শিশু ও বয়স্ক মানুষ নিয়ে নদী পার হতে ভয় লাগে।
লাঙ্গলবাঁধে নিয়মিত যাতায়াত করেন রফিকুল ইসলাম। তার ভাষ্য, নদী পার হতে ট্রলারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। মোটরসাইকেল সঙ্গে থাকলে ভাড়াও বেশি লাগে। বাজারের মালামাল নিয়ে যাতায়াত করতে আরও ভোগান্তি হয়।
প্রকল্পের ব্যবস্থাপক প্রতাপ গুণের ভাষায়, তিনি ৯ মাস ধরে দায়িত্বে আছেন। এর আগে নির্মাণাধীন সেতুর একটি গার্ডার ভেঙে পড়ায় কাজ বন্ধ ছিল। নদীতে স্রোত বেশি থাকায় কাজ চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব হয়নি। সংযোগ সড়ক না থাকায় নির্মাণসামগ্রী আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নতুন করে কাজ শুরু হচ্ছে জানিয়ে তিনি বললেন, ‘ঝিনাইদহ অংশে সংযোগ সড়কের কাজ চলছে। গার্ডার তৈরির মালামালও এসেছে। দ্রুত গার্ডার নির্মাণ শুরু হবে।’
জমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় সেতুর কাজ শুরু হতে কিছুটা দেরি হয়েছিল— জানালেন রাজবাড়ী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদ হাসান। ‘এখনো অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়নি। রাজবাড়ী অংশের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ আগামী বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে’— বললেন তিনি।




