গঙ্গাচড়া
‘সংসার চালামো না গরুক খোড়াক দেমো, এই চিন্তায় বাঁচি না’

ছবি: আগামীর সময়
‘কামের টাকায় পোয়াল কিনতে শ্যাষ হয়্যা যায়। সারাদিন কাম করি, দিন শ্যাষে যে টাকা হাতে আইসে সেই টাকার সোউগগুলা গরুর পোয়াল কিনতে চলি যায়। সংসার চালামো, না গরুক খোড়াক দেমো? এই চিন্তাতে বাঁচি না।’
রংপুরের গঙ্গাচড়ার কোলকোন্দ ইউনিয়নের তিস্তাপাড়ের বাসিন্দা আব্দুল মতিন মিয়া (৫৫) গরুর খাবারের খরচের হিসাব মেলাতে মেলাতে কথাগুলো বলছিলেন।
তার তিনটি গরু। দিনমজুরি করে যা আয় করেন, তার বড় একটি অংশই চলে যায় গরুর খাবার জোগাতে।
মতিন মিয়ার দিনে আয় প্রায় ৫০০ টাকা। তিনি জানান, তিনটি গরুর জন্য খড়সহ অন্যান্য খাবারে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হয়। ফলে দিনের আয় থেকে গরুর খাবারের খরচ মেটানোর পর সংসারের জন্য হাতে থাকে সামান্যই। স্থানীয় বাজারে বর্তমানে এক আটি খড়ের দাম ১৩ টাকা। প্রতিদিন প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক আটি খড় কিনতেই তার আয়ের বড় একটি অংশ চলে যায়।
আগে পরিস্থিতি এমন ছিল না। ধান কাটার মৌসুম শেষে গ্রামের বাড়িগুলোর উঠান, গোয়ালঘর কিংবা বাড়ির পেছনে খড়ের গাদা করে রাখা হতো। নিজের জমিতে ধান হলে গরুর খাবারের জন্য আলাদা করে খড় কিনতে হতো না। এখন জমি না থাকা, উৎপাদন কমে যাওয়া কিংবা আগের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় মতিন মিয়ার মতো অনেক পরিবারকে বাজারের খড়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এখনো আমন ধান কাটার সময় হয়নি। ফলে নতুন খড়ের সরবরাহও সীমিত। গরুকে না খাইয়ে রাখার সুযোগ নেই। তাই দিনমজুরির কাজের পাশাপাশি প্রতিদিন গরুর খাবার জোগাড়ের চিন্তাও করতে হচ্ছে তাকে।
তার ওপর মতিন মিয়ার দিনমজুরির কাজ নিয়মিত নয়। কোনো দিন কাজ থাকে, কোনো দিন থাকে না। কাজ না থাকলেও গরুর খাবারের খরচ থেমে থাকে না। ফলে কাজ না থাকা দিনগুলোতে সংসারের অন্য প্রয়োজন মেটানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবু গরুগুলো বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবেন না তিনি। তার কাছে তিনটি গরুই ভবিষ্যতের সঞ্চয়। গরুগুলো বড় হলে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তার ধারণা, হাতে টাকা থাকলে সংসারের নানা প্রয়োজনে তা খরচ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু গরু লালন-পালন করলে সেটি বড় হয়ে একসময় বড় অঙ্কের টাকায় পরিণত হবে। সেই আশাতেই বর্তমানের কষ্ট সামলে গরুগুলো ধরে রেখেছেন তিনি।
মতিন মিয়ার চাওয়া খুব বেশি নয়। নিয়মিত কাজ, সুস্থ শরীর আর কিছু টাকা জমাতে পারলেই মেয়ের বিয়েটা ভালোভাবে দিতে পারবেন–এটাই তার স্বপ্ন।
কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে প্রতিদিনের হিসাবটা কঠিন। দিনের আয় থেকে একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে গরুর খাবার। গরুগুলো ভবিষ্যতের সঞ্চয় হলেও সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার খরচ দিতে হচ্ছে বর্তমানের আয় থেকেই।
তিস্তাপাড়ের নিম্নআয়ের মানুষের কাছে গরু তাই শুধু গবাদিপশু নয়; অনেকের কাছে এটি সঞ্চয়, বিপদের দিনের ভরসা কিংবা পরিবারের বড় কোনো প্রয়োজন মেটানোর অবলম্বন। কিন্তু সেই সঞ্চয় ধরে রাখতেও বর্তমানের আয় থেকে বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। মতিন মিয়ার কথায় সেই টানাপোড়েনটাই যেন ধরা পড়ে–‘কামের টাকা পোয়াল কিনতে শ্যাষ।’



