বর্ষার আগমনী বার্তা নিয়ে ফুটেছে কদম

ছবি: আগামীর সময়
সকাল থেকেই আকাশে মেঘের আনাগোনা। মাঝে মাঝে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে মাটিকে। এমন এক বৃষ্টিস্নাত সকালে কালীগঞ্জের গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখ আটকে যায় রাস্তার ধারের একটি গাছে। সবুজ পাতার ভিড়ে ঝুলে আছে অসংখ্য গোলাকার ফুল। সাদা আর হলুদ রঙের ফুল যেন জানিয়ে দিচ্ছে বর্ষার আগাম আগমন। কদম ফুল, বাংলার বর্ষার চিরচেনা প্রতীক।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, সড়কের পাশ এবং বাড়ির আঙিনায় এখন ফুটতে শুরু করেছে কদম। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজের বুকজুড়ে ছোট ছোট সূর্য হাসছে। মেঘলা আবহে এই ফুল যেন প্রকৃতির নিজস্ব অলংকার হয়ে ওঠে।
একসময় গ্রামের শিশুদের কাছে কদম ফুল ছিল আনন্দের সঙ্গী। ফুলের গোল অংশ দিয়ে শিশুরা তৈরি করত খেলনা বল। সেই বল নিয়ে খেলায় মেতে উঠতো তারা। স্কুলপড়ুয়া শিশুদের হাতে কিংবা কিশোরীদের চুলে কদম ফুলের উপস্থিতি ছিল। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র অনেকটাই ম্লান হলেও বর্ষা এলেই পুরোনো স্মৃতিগুলো যেন আবার জেগে ওঠে।
উপজেলার ভাটিরা গ্রামের প্রকৃতিপ্রেমী ভাওয়াল আশরাফুল স্মৃতিচারণ করলেন, ‘কদম ফুল আমাদের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কিন্তু এখন আগের মতো কদমগাছ খুব একটা চোখে পড়ে না। বাণিজ্যিকভাবে চাষ না হওয়ায় কদমগাছের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।’
তিনি মনে করেন, দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় কদম গাছ পরিবেশের জন্য যেমন উপকারী, তেমনি এর কাঠও বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। তাই ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এর রোপণ বাড়ানো প্রয়োজন।
নদী ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল, কালীগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি আব্দুর রহমান আরমান বলেছেন, ‘কদম ফুল কেবল একটি ফুল নয়; এটি বাঙালির আবেগ, স্মৃতি ও সংস্কৃতির অংশ। বর্ষার সঙ্গে এর সম্পর্ক এতটাই গভীর যে কদম ছাড়া বর্ষাকে কল্পনা করাই কঠিন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, কদমগাছের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতাতেই কদমের গল্প পড়বে।’
হাউজফুল শো, তবুও প্রশ্ন
০৪ জুন ২০২৬
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার মোরসালিন মেহেদী জানান, কদম ফুল দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা সাহিত্য, গান ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বর্ষাকালে এর সৌন্দর্য মানুষের মনে বিশেষ অনুভূতির জন্ম দেয়।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম কামরুল ইসলাম বললেন, ‘শৈশবের অনেক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কদম ফুল। কদমগাছ সংরক্ষণ ও নতুন করে রোপণের বিষয়ে কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে উপজেলা প্রশাসন।’
বর্ষার প্রতি ফোঁটা বৃষ্টির সঙ্গে যেন কদম ফুলের এক অদৃশ্য বন্ধন রয়েছে। প্রকৃতির এই নিঃশব্দ দূত আজও বাংলার গ্রামবাংলাকে সাজিয়ে তোলে নিজস্ব রূপে। তাই কদমকে ঘিরে শুধু সৌন্দর্যের মুগ্ধতা নয়, প্রয়োজন সংরক্ষণও। কারণ কদম হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে বর্ষার এক টুকরো পরিচয়, হারিয়ে যাবে অসংখ্য মানুষের শৈশবের রঙিন স্মৃতি।






