ঈদের সিনেমার হিসাবনিকাশ
হাউজফুল শো, তবুও প্রশ্ন
- ঈদুল আজহা উপলক্ষে মুক্তিপ্রাপ্ত নতুন আট সিনেমা চলছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মাল্টিপ্লেক্স ও সিঙ্গেল স্ক্রিনে। টিকিট বিক্রি, দর্শকের প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা মিলিয়ে কোন সিনেমার অবস্থান কেমন জানা যাক...

‘রকস্টার’-এ শাকিব খানের নতুন লুক ও অভিনয় প্রশংসা কুড়িয়েছে। তার সঙ্গে আছেন সাবিলা নূর
কোরবানির ঈদকে ঘিরে দীর্ঘদিন পর দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে দেখা গেছে ব্যতিক্রমী এক প্রতিযোগিতা। একসঙ্গে মুক্তি পেয়েছে আটটি নতুন সিনেমা। তবে মুক্তির কয়েক দিন পরই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, দর্শক টানার ক্ষেত্রে সব ছবির অবস্থান এক নয়। হলসংখ্যা, টিকিট বিক্রি, দর্শক প্রতিক্রিয়া এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মূলত ‘রকস্টার’, ‘রইদ’, ‘মালিক’, ‘বনলতা সেন’ ও ‘মাসুদ রানা’। এর বাইরে ‘পিনিক’, ‘তছনছ’ ও ‘অফিসার’ নিয়ে দেওয়ার মতো কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
সিনেমার হালহকিকত
দেশের চলচ্চিত্র শিল্প এখনো প্রেক্ষাগৃহ সংকটে ভুগছে। বর্তমানে সচল হলের সংখ্যা প্রায় ১৫০। ঈদ উপলক্ষে সাময়িকভাবে কিছু হল চালু হওয়ায় মোট প্রদর্শনযোগ্য প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৭০-এ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে শাকিব খান অভিনীত ‘রকস্টার’। সিঙ্গেল স্ক্রিন ও মাল্টিপ্লেক্স মিলিয়ে ১০৩টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি ঈদের বক্স অফিসে সবচেয়ে বড় উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সের ৯টি শাখায় প্রথম দিনে ১৮টি শো পেলেও দর্শক চাহিদা বাড়তে থাকায় পরদিন শো সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬-এ। বর্তমানে স্টার সিনেপ্লেক্সে সর্বোচ্চ ৩৫টির বেশি শো নিয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে সিনেমাটি। দীর্ঘদিন পর অ্যাকশনধর্মী ইমেজ থেকে বেরিয়ে একজন রকস্টার চরিত্রে দেখা গেছে শাকিব খানকে। তার অভিনয়ের প্রশংসা করছেন অনেক দর্শক। কিন্তু গল্প, চিত্রনাট্য ও নির্মাণশৈলী নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। কেউ কেউ সিনেমাটিকে বড় পর্দার চলচ্চিত্রের চেয়ে টেলিফিল্মসদৃশ বলেও মন্তব্য করছেন। আবার মিউজিক্যাল ফিল্ম হিসেবে প্রচার করা হলেও ছবির গানগুলো দর্শকের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সাড়া ফেলতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া নায়কের অতিরিক্ত মাদকাসক্তির দৃশ্যও অনেক দর্শকের অপছন্দের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিচালক আজমান রুশো অবশ্য সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত অ্যাকশনধর্মী ধারার বাইরে গিয়ে ভিন্ন ধরনের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। এমন পরীক্ষামূলক সিনেমা সফল হলে ভবিষ্যতে আরও নতুন ধরনের গল্প নিয়ে কাজ করার সাহস পাবেন নির্মাতারা।
ঈদের আরেক আলোচিত সিনেমা ‘মালিক’। আরিফিন শুভ ও বিদ্যা সিনহা মিম অভিনীত ছবিটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (৩২) হল পেয়েছে। বহুদিন পর বড় পর্দায় শুভকে পুরোদস্তুর অ্যাকশন হিরোর ভূমিকায় দেখে উচ্ছ্বসিত দর্শক। তবে অনেকের অভিযোগ, অ্যাকশন দৃশ্যের ওপর অতিরিক্ত জোর দিতে গিয়ে গল্পের ধারাবাহিকতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ছবিটি নিয়েও দর্শক প্রতিক্রিয়া দুই ভাগে বিভক্ত।
অন্যদিকে, মুক্তির আগেই সমালোচক ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন নির্মিত ‘রইদ’। শুধু মাল্টিপ্লেক্সে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি ও মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। তাদের অভিনয়, সিনেমাটোগ্রাফি ও ভিজ্যুয়াল নির্মাণশৈলী ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেক দর্শক ছবিটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম শিল্পমানসম্পন্ন কাজ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তবে একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, ছবির গল্প ও প্রতীকী উপস্থাপনা সাধারণ দর্শকের জন্য জটিল হয়ে গেছে। অনেকেই বলছেন, সিনেমাটি তাদের ‘মাথার ওপর দিয়ে গেছে’।
একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত ‘বনলতা সেন’ নিয়েও। জীবনানন্দ দাশের জীবন, সাহিত্য এবং ব্যক্তিগত টানাপড়েনকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সিনেমায় মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন খায়রুল বাসার, মাসুমা রহমান নাবিলা ও সোহেল মণ্ডল। চলচ্চিত্রটি শিল্পমান ও নির্মাণশৈলীর জন্য প্রশংসা পাচ্ছে। তবে সাধারণ দর্শকের একটি অংশের কাছে এটি কিছুটা ধীরগতির এবং জটিল মনে হয়েছে।
কাজী আনোয়ার হোসেনের জনপ্রিয় গুপ্তচর চরিত্রকে বড় পর্দায় নিয়ে এসেছে ‘মাসুদ রানা’। পরিচালক সৈকত নাসির নির্মিত ছবিটিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রাসেল রানা এবং তার সঙ্গে আছেন পূজা চেরী। সিনেমাটি প্রশংসার পাশাপাশি ব্যাপক সমালোচনারও মুখে পড়েছে। গল্পের অসামঞ্জস্যতা, দুর্বল ভিএফএক্স ও এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ট্রল দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ‘পিনিক’, ‘অফিসার’ ও ‘তছনছ’ প্রত্যাশিত দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়েছে। জাহিদ জুয়েল পরিচালিত ‘পিনিক’-এ অভিনয় করেছেন আদর আজাদ ও শবনম বুবলী। দর্শকের একটি বড় অংশ ছবিটি দেখে হতাশার কথা জানিয়েছেন। একইভাবে পরিচালক বদিউল আলম খোকন নির্মিত ‘অফিসার’ ও ‘তছনছ’ নিয়েও সমালোচনা বেশি শোনা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা কী বলছেন
প্রেক্ষাগৃহ মালিক ও প্রদর্শকরাও এবারের ঈদবাজার নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী নন। কুমিল্লার কে-স্ক্রিনের মালিক ও প্রযোজক নেতা খোরশেদ আলম খসরুর মতে, এবারের ব্যবসাকে ‘মন্দের ভালো’ বলা যায়। দর্শকের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত মিশ্র এবং কোন ছবি শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার ইফতেখার হোসেন নওশাদও জানিয়েছেন, বড় বাজেটের অধিকাংশ সিনেমা মাল্টিপ্লেক্সকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় একক প্রেক্ষাগৃহগুলো চাপের মুখে রয়েছে। তবু প্রথম সপ্তাহে তার হলে ‘রকস্টার’-এর টিকিট বিক্রি হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকার।
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল মনে করেন, সীমিত সংখ্যক হলের বিপরীতে একসঙ্গে আটটি সিনেমা মুক্তি পাওয়ায় প্রত্যাশিত ব্যবসা হয়নি। এর সঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ এবং রাতজাগা খেলার প্রভাবও দর্শক উপস্থিতিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সব সমালোচনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট— দীর্ঘদিন পর ঈদের সিনেমা ঘিরে দেশের তরুণ দর্শকের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। স্টার সিনেপ্লেক্সের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এবার তরুণ দর্শকের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে সিনেমা দেখতে আসছেন অনেকেই। ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পরও দর্শকসংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশা করছেন তিনি।





