বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় বগুড়া নগরী

বগুড়া শহরের সেউজগাড়ীর কারমাইকেল সড়ক এলাকা, ছবি : আগামীর সময়
বগুড়া শহরের সেউজগাড়ী কৃষি ফার্ম এলাকার কারমাইকেল সড়ক। এ পথের অধিকাংশ পানিতে নিমজ্জিত। কৃষি ফার্মের পাশ দিয়ে পশ্চিমে সবুজবাগ। পুরো রাস্তা হাঁটুপানিতে ভর্তি। রাস্তা ও ড্রেন আলাদা করে বোঝা যায় না। মানুষ, যানবাহন নোংরা পানির মধ্যে দিয়েই চলাচল করছে।
এখানকার একটি বেসরকারি স্কুলের নিরাপত্তা প্রহরী সেলিম শেখ বলছিলেন, এখন তো তাও রাস্তার পিচ দেখতে পারছেন। আধাঘণ্টা আগে এলে তাও দেখতে পারতেন না। ওই পাশের রাস্তায় এখনও হাঁটু পানি জমে আছে।
আজ সোমবার সকাল থেকে টানা বৃষ্টির পর এমন পরিস্থিতি দেখা যায়। গত কয়েক বছর হলো বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যাচ্ছে বগুড়া নগরী। জলাবদ্ধ নগরে চলাচল করতে গিয়ে প্রতি নিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তা নোংরা পানিতে ডুবে যায়। আর বর্ষার মৌসুমে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
বগুড়া সিটি করপোরেশন বলছে, বগুড়ার অধিকাংশ রাস্তা ও ড্রেন জনসাধারণের বসবাসের তুলনায় অপ্রতুল। সময়োপযোগী সমাধানের জন্য পুরো নগরীর রাস্তা, ড্রেনসহ সব বিষয় নিয়ে মাস্টার প্ল্যানের কাজ চলছে।
সেউজগাড়ী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এখানকার সব রাস্তাতেই পানি জমেছিল। তবে বৃষ্টির ঘণ্টাখানেক পর সেগুলো কমে যায়। শুধু সবুজবাগ, মালগ্রাম এলাকায় পানি জমে আছে। এখানকার পুরোনো বাড়িঘরগুলোও কিছুটা নিচু। এই অবস্থার কারণে সেউজগাড়ীস্থ পাট অধিদপ্তর কার্যালয়ের সিঁড়িঘরে পানি জমে থাকে অনেকক্ষণ।
সেউজগাড়ী কৃষি ফার্মের ঠিক উল্টো পাশের ভবনে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের কার্যালয়। সেখানে কর্মরত ফরিদুল ইসলাম জানালেন, গত বছরেও একই পরিস্থিতি ছিল। বৃষ্টি হলেই রাস্তা ডুবে যায়। অথচ এখানে বড় ড্রেন আছে। তবুও কাজ হয় না।
পাশের সবুজবাগ এলাকা থেকে হেঁটে আসা মনোয়ারা নামে এক নারী বললেন, বর্ষার সময় তো এদিকে রিকশাও আসে না। আমাদের এখন নৌকা নিয়ে আসতে হবে। এগুলো দুঃখের কথা কাকে কি বলব?
বগুড়া আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে সোমবার বগুড়ায় ৬৭ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর থেকে কম বৃষ্টিতেও শহরের কেন্দ্রবিন্দু সাতমাথায় পানি জমে। এই জলনিমগ্নতার সমস্যা প্রায় সব ওয়ার্ডেই। সূত্রাপুর, ঠনঠনিয়া, ফুলদিঘী, চকফরিদ, জহুরুল নগর, বাদুরতলা এলাকায় বৃষ্টি হলেই এই সমস্যা সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি জলেশ্বরীতলা, মফিজপাগলার মোড়েও পানি জমে থাকছে।
তবে সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা বর্ধিত ১৩ থেকে ২১ ওয়ার্ডগুলোয় ড্রেনেজ ব্যবস্থা বেশি করুণ। এখানে অধিকাংশ স্থানে পর্যাপ্ত ড্রেন নেই। ফলে নিত্যদিনকার পানিও নিষ্কাষণ হয় না। এর ওপর যখন বৃষ্টি হয়, তখন ভোগান্তির চরম অবস্থা দেখতে হয় বাসিন্দাদের।
১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ফুলদীঘি এলাকার বাসিন্দা আফতারুন নাহার জানালেন, আমার বাড়ির রাস্তা দিয়ে ১২ ও ১৩ দুই ওয়ার্ডের মানুষ যাতায়াত করেন। এই রাস্তা ২০ বছর আগে পাকা করা হয়েছে। এরপর আর সংস্কার হয়নি। এখন রাস্তার পিচ উঠে খানাখন্দ হয়েছে। কিছু অংশে মাস্টার ড্রেন নেই। সেখানে বাসা-বাড়ির বর্জ্য পানি রাস্তায় ভেসে বেড়ায়। প্রতি নিয়ত এই রাস্তা দিয়ে আমাদের চলাচল করতে হচ্ছে।
বগুড়া সিটি করেপোরেশন অতিসম্প্রতি গেজেটভুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি করপোরেশন উদ্বোধন করেন। এর আগে এটি বগুড়া পৌরসভা ছিল।
ইতিহাস বলছে, ১৮৭৬ সালে ১ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার এবং তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে বগুড়া পৌরসভা প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৮১ সালে এটি ক শ্রেণিতে পৌরসভায় উন্নীত করে তৎকালীন সরকার। তখন এর আয়তন হয় ১৪ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার। ওয়ার্ড ভাগ করা হয় ১২টিতে।
২০০৬ সালে পৌর এলাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৬৯ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটারে উন্নীত হয়। আরও ৯ টি ওয়ার্ড গঠন করে বাংলাদেশের বৃহত্তম পৌরসভায় রুপান্তর নেয় এটি। সেই এলাকাগুলো নিয়ে এবার গঠিত হয়েছে বগুড়া সিটি করপোরেশন।
এ নগরে বর্তমানে অন্তত ১০ লাখ মানুষের বসবাস। প্রতিদিন আরও কয়েক লাখ মানুষ কাজের সুবাদে বাইরের জেলা ও উপজেলা থেকে আসা-যাওয়া করে। তবে প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো এই শহরে কখনওই মাস্টার প্ল্যান গঠন করা হয়নি। এ জন্য বিশাল শহরটি গড়ে উঠেছে এলোমেলোভাবে।
এ জন্য সুষ্ঠুভাবে বর্জ্যপানি নিষ্কাশন হয় না। সড়কে যানযটসহ নানা সমস্যায় নগরবাসী প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহায়।
সাবেক বগুড়া পৌরসভার ওয়েবসাইট ও বাজেটপত্রের তথ্য বলছে, বগুড়া শহরে প্রায় ১২০০ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। এর মধ্যে বর্ধিত এলাকার প্রায় ৩০০ কিলোমিটার ড্রেনই কাঁচা।
ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে বগুড়া সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান বলেছেন, আমাদের নগরীর সার্বিক বিষয় নিয়ে মাস্টার প্ল্যানের কাজ চলছে। তবে এটি হতে সময় লাগবে। এ ছাড়া পুরো নগরীর অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আমরা একটি ডিপিপি দিয়েছি। অনুমোদন হলে জনগণের অনেক সমস্যাই লাঘব হবে।
এ ছাড়া বৃষ্টিতে পানি জমে জনভোগান্তির বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী জানালেন, বগুড়ায় জলাবদ্ধতা হয়, এটা বলা যাবে না। কারণ দু-তিন দিন ধরে পানি জমে থাকলে তখন জলাবদ্ধতা বলা যায়। তবে আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুব একটা ভালো না থাকার জন্য পানি জমছে। কিন্তু সেটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নেমে যায়। আর কোনো এলাকায় বেশি সমস্যা থাকলে সেখানকার বাসিন্দারা যদি আমাদের জানান, আমরা জরুরী ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিব।
মাস্টার প্ল্যানের বিষয়ে বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেছেন, আমাদের মূল লক্ষ্য এখন মাস্টার প্ল্যান। এটি প্রনয়ন করতে আমাদের অন্তত এক বছর সময় লাগবে।






