বিতর্কের মুখে কুড়িকৃবির স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান নির্ধারণের প্রতিবেদন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুড়িকৃবি) স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য তিনটি স্থান নিয়ে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তৈরি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তিন ধরনের মূল্যায়ন। কোথাও বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি, কোথাও নদীর নৈকট্য, আবার কোথাও জমির অপর্যাপ্ততার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনের এসব তথ্যের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় পাওয়া গেছে বেশ কিছু অসংগতি। বিশেষ করে নদীর দূরত্ব ও ভূমির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান নির্ধারণে প্রতিবেদনটির তথ্যের যথার্থতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ টি এম বেনজীর রহমানের স্বাক্ষরিত ১২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো হয় ৩ সেপ্টেম্বর। এর আগে ১৬ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখার এক চিঠিতে কুড়িকৃবির স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য দাশেরহাট ছড়া, নালিয়ার দোলা ও ছিনাই এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়। প্রতিবেদনে তিনটি স্থানের জমির পরিমাণ, বন্যার ইতিহাস, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং নদীর দূরত্ব বিবেচনায় পৃথক মূল্যায়ন করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দাশেরহাট ছড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সম্ভাব্য জমির পরিমাণ ২৩৩ দশমিক শূন্য ৫ একর। গত ২০ বছরের বন্যার তথ্য পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ পানির উচ্চতা ছিল ২৮ দশমিক ৪৪ মিটার এবং ২০১৯ সালে ২৮ দশমিক ২৮ মিটার। এসব বন্যায় প্রস্তাবিত এলাকার সামনের সড়ক পানিতে তলিয়ে না গেলেও স্থানটি ডুবে গিয়েছিল। বন্যার ঝুঁকি কমাতে ভূমি থেকে সড়কের সমতল পর্যন্ত প্রায় ১০ ফুট উচ্চতায় মাটি ভরাটের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালের পানি সরাসরি ধরলা নদীতে চলে যাওয়ায় প্রাকৃতিক জলাবদ্ধতার আশঙ্কা নেই।
অন্যদিকে, নালিয়ার দোলায় প্রায় ২৫০ একর জমি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রায় ১২ ফুট উচ্চতায় মাটি ভরাটের প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক পানি জমে থাকার প্রবণতা এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকার কথা উল্লেখ করে স্থানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত স্থান থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের দূরত্ব মাত্র দেড় কিলোমিটার। এ কারণে বন্যা ও অবকাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
ছিনাই এলাকায় জমির পরিমাণ মাত্র ৬ একর বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। জায়গাটি তুলনামূলক উঁচু হওয়ায় মাটি ভরাটের প্রয়োজন নেই। তবে পানি নিষ্কাশনের জন্য পাশ দিয়ে কোনো খাল না থাকায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে। ধরলা নদী দেড় কিলোমিটার দূরে হওয়ায় বন্যার ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় জমির তুলনায় জায়গাটি অনেক ছোট হওয়ায় সেখানে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে ভবিষ্যতে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় অমিল দেখা গেছে নালিয়ার দোলা ও ছিনাইয়ের ক্ষেত্রে। নালিয়ার দোলার বাসিন্দা আলাউদ্দিনের দাবি, তাদের এলাকা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের দূরত্ব দেড় কিলোমিটার নয়, প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার। তার মতে, সেখানে কখনো নদীভাঙনের ঘটনাও ঘটেনি। এ কারণে স্থানটিকে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করাকে তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন।
একইভাবে ছিনাইয়ের বাসিন্দা জমির উদ্দিনের দাবি, তাদের প্রস্তাবিত স্থান থেকে ধরলা নদীর দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। প্রতিবেদনে দেড় কিলোমিটার উল্লেখ করায় তিনি এর যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
দাশেরহাট ছড়ার ক্ষেত্রেও স্থানীয়দের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। হলোখানা ইউনিয়নের এ এলাকায় জমির পরিমাণ বেশি হলেও অধিকাংশই বিল ও নিচু জমি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বড় আকারের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে না তুললে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণের পর আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। প্রতিবেদনে ১০ ফুট মাটি ভরাটের কথা বলা হলেও এলাকাটির কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীর খাল রয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা।
প্রতিবেদনটির বিষয়ে জানতে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ টি এম বেনজীর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তা নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
তবে তিনটি স্থানের নদী থেকে দূরত্ব, বন্যার উচ্চতা, জমির প্রকৃত অবস্থা ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা নির্ধারণে কী ধরনের কারিগরি জরিপ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তার কাছ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।



