যমুনায় ভাঙন
চোখের সামনেই বিলীন বসতবাড়ি-কৃষিজমি

ছবি: আগামীর সময়
‘চোখের সামনে নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে বসতবাড়ি। ঘরের চাল কোনো রকমে রক্ষা করা গেছে। কিন্তু ভেসে গেছে সংসারের অন্য আসবাবপত্র। কৃষিজমি আর ভিটা মাটির অর্ধেক গেছে নদীর পেটে। যতটুকু আছে তাও থাকবে আর না। অনবরত ভাঙনে প্রতিদিনই মাটি খসে পড়ছে যমুনার বুকে। এখন ফসলের একটি জমি আছে, সেটা গেলে আমাদের আর কিছু থাকবে না।’
যমুনা নদীর গর্ভে বিলীন হওয়া আধখানা ভিটার ওপর দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন চর ঘাগুয়ার বাসিন্দা জুঁই বেগম।
বগুড়ার সারিয়াকান্দির কাজলা ইউনিয়নের গ্রাম এটি। গত এক মাস ধরে এই এলাকায় নদীভাঙন দেখা দেয়। এতে গ্রামের ১১ পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়। আতঙ্কে আছেন অন্য বাসিন্দারাও।
চর ঘাগুয়ায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষের বসবাস। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সবই আছে সেখানে। ১৯৮৮ সালে এই অঞ্চলে বড় বন্যার পর বিভিন্ন চরের ভাঙনের শিকার মানুষরা এসে এখানে বসতি গড়েছিলেন। এরপর কেটে গেছে অনেক বছর। এর মধ্যে ছোট ছোট ভাঙন ছিল। কিন্তু এবারের ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
নদী ভাঙনের প্রভাব পড়েছে জুঁই বেগমদের মতো অনেকে পরিবারে। জুঁই জানালেন, ‘দেড় মাস আগে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে বৈদ্যুতিক লাইন নিয়েছিলেন তার স্বামী রফিকুল ইসলাম। সেই বৈদ্যুতিক খুঁটিও নদীতে বিলীন হয়েছে। ছেলে-মেয়ের পড়ালেখা বন্ধ। খাওয়া-দাওয়ার কোনো ঠিক নেই।’
গত বুধবার (৩ জুন) সকালে সরেজমিন যাওয়া হয় চর ঘাগুয়ায়। সারিয়াকান্দি উপজেলার এই গ্রামটি বগুড়ার একবোরে পূর্বে। এর উত্তর-পূর্ব দিকে জামালপুরের অংশ। নৌকা গ্রামের কাছে আসতেই নদীভাঙনের বিধ্বংসী রূপ ধরা দেয় চোখে। মনে হয় যেন কিছুক্ষণ আগেই চাপ চাপ মাটি ধসে গেছে নদীতে। বাইরের মানুষ দেখে একটু একটু করে লোকজন ঘর থেকে বেরিয়ে জড়ো হতে থাকে নদীর ধারে। হাত দিয়ে ইশারা করে মূল ভাঙনের দিকে। সেদিকে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ে প্রায় ১৫-২০ বছরের পুরনো এক সেতু ও কাঁচা গ্রামীণ সড়ক। নদী ভেঙে সেতুর কয়েক হাত সামনে এসে যেন থমকে গেছে।
সেতুর উত্তর পাশের পাড়াটি এখন নদীর অতলে। যতটুকু আছে সেখানে নদীর আগ্রাসনের ছাপ। রফিকুলের ভিটেতে নজরে পড়ে গরু রাখার স্থান। ভেঙে যাওয়া চুলার পাড়। গাছের কাটা গোড়া। সেই গাছের গোড়া স্বাক্ষী হয়ে উঁকি দিচ্ছে। অদূরে ফসলি জমিতে রাখা টিনের চাল, বেড়া। ঘর বসানোর জায়গা না থাকায় অন্যের জমিতে ফেলে রেখেছেন তারা।
সেতু পেরিয়ে কাঁচা রাস্তায় এগোতে দেখা মিলে গাছে বাঁধা গোটা দশেক গরু। মালিকের সঙ্গে এরাও বাস্তুচ্যুত। তার পাশে কয়েক নারী নিজেরাই গল্প করছেন। বলছিলেন, ‘রাত নামলেই আতঙ্ক বেশি হয়। দিনে তাও দেখা যায়, বোঝা যায়। রাতে ঘুমের মধ্যে কোন বাড়ি নদীর পেটে যায়। তাই আতঙ্কে ঘুম আসে না।’
গল্প থেকে সরে নাতনিকে কোলে নিয়ে নদীর পাড়ে আরেকটু এগিয়ে যান রেজিয়া। শূন্যতা চোখে নিয়ে আপন মনে বলছিলেন, সরকার এত কিছু করে, এত টাকা খরচ করে, আমাদের এই নদী বেঁধে দিতে পারে না। চরের মানুষের দুঃখ কেউ দেখে না…
চর ঘাগুয়ায় নদী পাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে সম্প্রতি কথা হয় বণিজ মণ্ডলের (৪৫) সঙ্গে। রফিকুলের ভিটা জমিতে বসে নদীর ভাঙন দেখছিলেন। তার বাড়ির সবটুকুই এখন নদী গর্ভে।
তিনি জানালেন, প্রতি বছরই এখানে ভাঙন হচ্ছে। নদী আমাদের বাড়ি থেকে আরও অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে ছিল। ভাঙতে ভাঙতে এবার আমার বাড়ি গেছে। সরকার যদি এখানে কোনো ব্যবস্থা না নেয়, আমাদের ফসলি জমি হারিয়ে এলাকা ছাড়তে হবে।
স্থানীয়রা জানান, অনেকদিন এখানে ভাঙন ছিল না। প্রায় ১০ বছর আগে থেকে কাজলা ইউনিয়নে উজানে জামালপুর অংশের ইসলামপুর এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় কাজলা ইউনিয়নের ট্যাকা মাগুড়িয়া, উত্তর ও দক্ষিণ বেণীপুর, কাজলা, কুড়িপাড়া, পাখিমারা, মিটনপাড়া ও ময়ূরের চরের সবটুকুই বিলীন হয়েছে যমুনার গর্ভে।
২০২৩ সালেও চর ঘাগুয়ায় বড় ভাঙন হয়। ওই সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধ করে। এবার বর্ষার আগেই ভাঙনের তীব্রতা দেখা দিয়েছে।
চর ঘাগুয়া গ্রামে দুটি বাজার, দুটি স্কুল, তিনটি মাদ্রাসা, একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র আছে। এখানে ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নিলে গ্রামটিও বিলীন হবে।
চরঘাগুয়ার বাসিন্দা মিনাল হোসেন বলেছেন, স্থায়ী নদীর পাড়ে বাঁধ দিতে সময় লাগবে। কিন্তু আমাদের সেই সময় নেই। গ্রামের মানুষ সব সময় আতঙ্কের মধ্যে আছে। এখন জিওব্যাগ ফেললে আপাতত এবারের ভাঙন কমানো যাবে।
যমুনার বাম তীর এলাকা ঘুরে জানা গেছে, শুধু চর ঘাগুয়া নয়। নদীভাঙনের ঝুঁকিতে আছে যমুনা নদীর বাম তীরের মানিকদাইড়, শনপচা চর। ব্রহ্মপুত্রের ধারা যমুনা নদী মূলত চরবেষ্টিত। প্রতি বছর এই নদীতে পানির সঙ্গে কয়েক লাখ ঘনফুট পলি ভেসে যায়। পলির কারণে নদীতে চর জেগে ওঠে। আবার বন্যায় অনেক চর ভেঙেও যায়। কাজলা ইউনিয়নের অংশে মূল নদীতে চর জেগে ওঠায় পানির চাপ পড়ছে বাম তীরে। ফলে এখানে নদীভাঙন তীব্র হয়েছে বিগত কয়েক বছরে।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাজলা ইউনিয়নে প্রায় ৯০০ মিটার জুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পরিদর্শন করেছেন ঘটনাস্থল। নদীভাঙন প্রতিরোধেও নেওয়া হয়েছে কিছু পরিকল্পনা।
দপ্তরটির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেছেন, আমরা এরই মধ্যে সম্ভাব্য ব্যয় যাচাই করেছি। সেই আলোকে প্রায় ৪৬ কোটি টাকা একটি ডিপিপি (প্রকল্প প্রস্তাবনা) দাখিল করেছি। আমরা আশাবাদী খুব দ্রুত অনুমোদন সাপেক্ষে আমরা সেখানে কাজ শুরু করতে পারব।




