শিবচর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
জনবল সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে চিকিৎসাসেবা, ভোগান্তিতে রোগী

সংগৃহীত ছবি
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে চিকিৎসাসেবা। ১০০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে উন্নীত হলেও প্রয়োজনীয় লোকবল নেই এখানে। ফলে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শ শ রোগী।
কর্তৃপক্ষ জানালেন, ২০২২ সালের নভেম্বরে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয় হাসপাতালটি। ২০২৫ সালের ২৫ মে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয় নতুন আধুনিক ভবন। এখনো ৫০ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে হাসপাতালটির কার্যক্রম। ১০০ শয্যার হাসপাতালের জন্য ৭০ জন চিকিৎসক ও ৪৫ জন সেবিকা প্রয়োজন হলেও কর্মরত মাত্র ১১ চিকিৎসক ও ২৮ জন সেবিকা। সীমিত জনবল দিয়ে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে গিয়ে ব্যাহত হচ্ছে সেবার মান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে সার্জারি, অর্থোপেডিকস ও গাইনি বিভাগের কনসালট্যান্ট, আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) এবং অ্যানেসথেটিস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া প্যাথলজি বিভাগের অনুমোদিত তিনটি পদের বিপরীতে নেই কোনো টেকনিশিয়ান। এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন ধরে অচল। সেল কাউন্টার মেশিন ও হরমোন অ্যানালাইজার না থাকায় ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের বাইরে যেতে হচ্ছে।
পৌরসভার জনবলে চলছে সিটি
২৬ মে ২০২৬
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকটও এখানে প্রকট। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পাঁচটি পদই শূন্য। নিরাপত্তাপ্রহরীর দুটি পদেও নেই কেউ। অফিস সহায়কের পাঁচটি পদের মধ্যে শূন্য তিনটি। এ ছাড়া মালি, ওয়ার্ড বয়, আয়া, ফিজিওথেরাপি, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং, ক্যাশিয়ার, প্রধান সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর, মালি ও টিকিট ক্লার্কসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন সকাল থেকে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ রোগীদের উপচে পড়া ভিড় থাকে বহির্বিভাগে। গড়ে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন বহির্বিভাগে। অন্যদিকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন প্রায় ১৪০ থেকে ১৬০ জন রোগী। শয্যা সংকটের কারণে মেঝেতে থেকেই চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে অনেক রোগীকে।
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রোগীরা। তাদের অভিযোগ, নতুন ভবনের অনেক কক্ষেই ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে এবং শৌচাগারের পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা।
মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক রোগীর স্বজন মো. জহির মিয়া অভিযোগ করে জানালেন, রোগীকে ভর্তি করার সময় কক্ষ ও শয্যার নিচে ময়লা-আবর্জনা দেখতে পান। অভিযোগ করার পরও তা পরিষ্কার করা হয়নি। পরে নিজেরাই পরিষ্কার করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা কবির খান মন্তব্য করেন, হাসপাতালের শৌচাগারের পরিবেশ এতটাই নোংরা যে সেখানে প্রবেশ করাও কষ্টকর। এমন পরিবেশে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন।
আরেক রোগীর স্বজন মো. আব্দুল্লাহর ভাষ্য, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও সেবিকা না থাকায় প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে করাতে হচ্ছে, ফলে গরিব মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা মো. ইব্রাহিম মিয়া বলেছেন, জনবল সংকটের কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চরম চাপে রয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ করা হলে রোগীদের আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফাতিমা মাহজাবীন জানালেন, চতুর্থ শ্রেণির ১৯টি পদের মধ্যে মাত্র তিনটিতে জনবল রয়েছে, বাকি ১৬টি পদ শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির মঞ্জুরী করা সাতটি পদও খালি। নতুন ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও জনবল সংকটের কারণে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত শিবচর উপজেলা। এই উপজেলার জনগোষ্ঠীর জন্য হাসপাতালটি প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। স্থানীয়রা দাবি করেন, আধুনিক ভবন নির্মাণের পাশাপাশি দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ না করা হলে স্বাস্থ্যসেবার সংকট আরও গভীর হবে।







