মাঠের হাসি হাটে মলিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নওগাঁর মাঠ জুড়ে আউশ ধানের সোনালি শিষ। কোথাও ধান কাটা চলছে, কোথাও মাঠের পাশে বা বাড়ির উঠানে চলছে মাড়াই। এরপর রোদে শুকিয়ে সেই ধান নিয়ে কৃষকরা ছুটছেন স্থানীয় হাটে। ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকের মুখেও স্বস্তির হাসি। কিন্তু সেই স্বস্তি ম্লান হয়ে যাচ্ছে বাজারদরে। ধান বিক্রি করতে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না তারা। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর এতটাই কম যে, ভালো ফলনেও লোকসানের হিসাব কষতে হচ্ছে কৃষকের।
তারা বলছেন, এবার আউশের ফলন প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হয়েছে। কিন্তু ধান বিক্রি করতে গিয়ে পাচ্ছেন না কাঙ্ক্ষিত দাম। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচই উঠছে না। ফলে ভালো ফলন পেয়েও লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। এর সঙ্গে ঋণের কিস্তি, পরিবারের খরচ এবং পরবর্তী আমন চাষের প্রস্তুতির ব্যয় যুক্ত হওয়ায় চাপ আরও বাড়ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নওগাঁর ১১টি উপজেলায় আউশের আবাদ হয়েছে ৫৮ হাজার ৪৭৩ হেক্টর জমিতে। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ৩ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে। আবাদ বাড়াতে জেলার ৬৬ হাজার প্রান্তিক কৃষককে দেওয়া হয় বিনামূল্যে সার ও বীজ। ভাদ্রের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছে আউশ ধান কাটা ও মাড়াই। মহাদেবপুর, পত্নীতলা ও মান্দা উপজেলায় এবার আউশের আবাদ বেশি হয়েছে।
মহাদেবপুরের নওহাটা গ্রামের কৃষক মমতাজ উদ্দিনের ভাষ্য, প্রতি বিঘায় ২২-২৭ মণ পর্যন্ত ধান পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বিক্রি করে হিসাব মিলছে না। তার হিসাবে, হালচাষ, সম্পূরক সেচ, বালাইনাশক, শ্রমিকের মজুরিসহ প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে ১২-১৫ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ দাঁড়ায় ৪৪৪-৬৮২ টাকা। অথচ বর্তমানে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকা।
শুধু নিজের জমিতে চাষ করা কৃষক নন, বাজারদরের এই চাপে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন বর্গাচাষিরাও। মহাদেবপুরের সারতা গ্রামের বর্গাচাষি লুৎফর রহমান আড়াই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আউশ আবাদ করেছেন। চাষের খরচ মেটাতে তাকে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। হালচাষ, সেচ, সার ও কীটনাশকের জন্য নিতে হয়েছে মহাজনি ঋণও। তার আড়াই বিঘা জমিতে আউশ চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু ধান বিক্রি করে সেই অর্থও উঠছে না।
কৃষকরা বলছেন, উৎপাদন খরচ বাড়লেও ধানের দাম সে তুলনায় বাড়েনি। বরং গত বছরের তুলনায় এবার জাতভেদে প্রতি মণ ধানের দাম কমেছে। ফলে ফসল ঘরে তোলার পরই ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হচ্ছে।
এই চিত্র আরও স্পষ্ট দেখা যায় মহাদেবপুর উপজেলার সরস্বতীপুর হাটে। ভোর থেকেই ভ্যান ও ট্রলিতে করে কৃষকরা বস্তাভর্তি নতুন ধান নিয়ে হাটে আসছেন। আড়তদার, ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীদের কাছে ধান বিক্রি করছেন তারা। কিন্তু দরদাম শুরু হওয়ার পর অনেক কৃষকের মধ্যে হতাশা দেখা যায়। বর্তমানে নতুন আউশ ধান প্রতি মণ ৭০০-৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই হাটে পুরনো জিরাশাইল, কাটারিভোগ ও বিআর-২৮ ধানের দাম ৮০০-৯৫০ টাকা। নতুন আউশের সরবরাহ বাড়ায় পুরনো বোরো ধানের দামও কমেছে।
হাটের আড়তদার ফরিদ হোসেন বললেন, ‘ধানের বাজার এখন নিম্নমুখী। আউশ ধান বাজারে আসার পর থেকেই দাম কমতে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ ধানের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।’
দাম কমার কারণ হিসেবে মিল মালিকদের পক্ষ থেকে অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদারের ভাষ্য, মিলার ও আড়তদারদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট করে ধানের দাম কমানোর অভিযোগ সত্য নয়। তার দাবি, ধান-চালের বাজার অনেকটাই বড় মিলার ও করপোরেট ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল; ছোট মিলারদের এখানে তেমন ভূমিকা নেই।
ফরহাদ হোসেনের মতে, গত বোরো মৌসুমে দেশে ধানের উৎপাদন ভালো হওয়ায় সরবরাহ বেড়েছে বাজারে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল আমদানি হওয়ায় মজুদও পর্যাপ্ত। এতে দেশীয় চালের চাহিদা কমেছে। করপোরেট পর্যায়ে চালের বিক্রি কমে যাওয়ায় মিলাররাও ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকারি গুদামে চাল সংগ্রহ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। তা না হলে আসন্ন আমন মৌসুমেও কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা তার।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান জানালেন, চলতি অর্থবছরে আউশের ফলন সবচেয়ে ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও কম ছিল। তবে কৃষকের প্রকৃত লাভ নির্ভর করছে বাজারদরের ওপর।



