১২ দিনে ৭ মৃত্যু, কেরানীগঞ্জ জুড়ে আতঙ্ক

মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে ঢাকার কেরানীগঞ্জে পৃথক সাতটি মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একাধিক হত্যাকাণ্ড, রহস্যজনক মৃত্যু এবং একটি আত্মহত্যার প্রাথমিক ধারণার ঘটনা।
অধিকাংশ ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করলেও একের পর এক এমন ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৫ দিনের বিশেষ অভিযান শুরু করেছে ঢাকা জেলা পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ মডেল ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার বিভিন্ন এলাকায় পৃথক সাতটি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ছয়টি ঘটনায় মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং একটি ঘটনায় ছুরিকাঘাতে আহত এক কিশোরকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার শুরু হয় কেরানীগঞ্জ মডেল থানার খোলামোড়া এলাকায় রুহুল আমিন (৪০) নামে এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করলেও অপমৃত্যুর মামলা করে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
এরপর ২৬ জুলাই সকালে খোলামোড়া মডেল টাউনের রসুলবাগ টাইলস মসজিদ এলাকা থেকে মমতাজ (৩০) নামে এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মিন্টু নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
২৮ জুলাই সকালে কালিন্দী ইউনিয়নের গ্রিন সিটিসংলগ্ন বালুর মাঠ থেকে তানজিলা (১৬) নামে এক কিশোরীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার হয়। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডে তার প্রেমিক রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
৩০ জুলাই সকালে হযরতপুর ইউনিয়নের ভাটারাকান্দি এলাকায় নিজ বাড়ির পাশ থেকে অটোরিকশাচালক লিয়াকত আলীর (৬০) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার ছেলে ফারুককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
৩১ জুলাই সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পের একটি পরিত্যক্ত প্লটের জঙ্গল থেকে হাসিনা বেগমের (৭০) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিন দুপুরে আগানগর পাওয়ার হাউজ এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে ধূমপানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে হাসান (১৭) নামে এক কিশোর ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। ওই ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
সবশেষ ১ আগস্ট বিকালে হাসনাবাদ এলাকার একটি পরিত্যক্ত ইটভাটার পাশের জঙ্গল থেকে নির্মাণশ্রমিক চান মিয়া গাজী ওরফে চান্দুর (৬৫) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তদন্তে নেমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) একজন সন্দেহভাজনকে আটক করেছে।
একের পর এক এসব ঘটনায় কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে হত্যাকাণ্ড ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সন্ধ্যার পর নির্জন এলাকায় চলাচল নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অপরাধ দমনে পুলিশের টহল ও নজরদারি আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে পুলিশ বলছে, ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র বা সিরিয়াল হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিরুল হক বললেন, ‘প্রতিটি ঘটনার পেছনে আলাদা কারণ রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, অধিকাংশ ঘটনাই ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা সামাজিক অবক্ষয়ের ফল। তাই জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর মতো পরিস্থিতি নেই।’
তিনি জানালেন, রুহুল আমিনের মৃত্যুর ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। মমতাজ, তানজিলা ও লিয়াকত আলী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাসান হত্যা মামলার আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে এবং চান মিয়া গাজীর মৃত্যুর ঘটনায় পিবিআই তদন্ত করছে।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেছেন, প্রতিটি ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৫ দিনের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় কেরানীগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে পুলিশের এই বিশেষ অভিযান কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।






