১০৯ এতিম মেয়ের ‘বাবা’ রুবেল

মেয়ের বাবা প্রায় আট বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাই সংসারে হাল ধরার মতো তেমন কেউ না থাকায় দুশ্চিন্তা ভর করে মায়ের। একদিকে, সংসারের চাকা সচল রাখা। অন্যদিকে ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার পাশাপাশি বিবাহযোগ্য মেয়েকে ভালো পাত্রের হাতে তুলে দেওয়া। হঠাৎ করে ভালো পাত্রের সঙ্গে বিয়ের সমন্ধ ঠিক হলেও দুশ্চিন্তা ভর করে বিয়ের খরচাপাতি নিয়ে। এরই মধ্যে একটি এনজিওর মাধ্যমে খোঁজ পান একজন মানবিক ও মহৎ মানুষের। যিনি এরই মধ্যে ১০৮টি এতিম ও দরিদ্র পরিবারের মেয়ের দায়িত্ব নিয়ে বিয়ে দিয়েছেন।
সেই মানুষটি হলেন নাটোরের বড়াইগ্রামের ব্যবসায়ী রুহুল আমিন রুবেল। মানবিক এই মানুষটির মহৎ উদ্যোগে ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ঈশানগাতী গ্রামের এতিম কন্যা রাবেয়া খাতুনের (১৯)।
বিয়ে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চারিদিকে আনন্দ-উৎসব। কেউ ব্যস্ত গায়ে হলুদের জন্য, কেউ ব্যস্ত রঙ উৎসবে। কেউবা বিয়ের রান্না-বান্না ও সাজ-সজ্জার আয়োজনে। গত তিন দিন ধরে এমনই উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো নড়াইলের ঈশানগাতী গ্রামের মৃত জালাল মোল্যার মেয়ে রাবেয়া খাতুনের বিয়ে। তার বিয়ে উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন সবাই এসেছেন পাত্রীর বাড়িতে। প্রবেশদ্বার (গেট) থেকে শুরু করে বাড়ির ভেতরে করা হয়েছে সাজ-সজ্জার আনুষ্ঠানিকতা। দরিদ্র সংসারে এমন উৎসবমুখর বিয়ে সম্পন্ন করতে পেরে খুশি পাত্রী রাবেয়া খাতুনের মা হেলেনা বেগমসহ পরিবার-পরিজন।
রাবেয়ার বাবা জালাল মোল্যা অসুস্থতার কারণে মারা যাওয়ার পর তার মা তিন ছেলে এবং একমাত্র মেয়েকে নিয়ে কোনোভাবে সংসারের চাকা সচল রাখেন। সংসারের বড় সন্তান উপার্জনক্ষম হলেও সংসার ভিন্ন হওয়ায় তার মায়ের ওপরই তিন সন্তানকে লালন-পালনের দায়িত্ব পড়ে। মা হেলেনা বেগমের সামান্য উপার্জনে চলছে তাদের সংসার।
দরিদ্র সংসারের ধুমধাম করে বিয়ে সম্পন্ন হওয়া খুশি প্রতিবেশিসহ গ্রামবাসীও। তারা এমন মানবিক কাজের প্রশংসা করেন সবাই। গত বুধবার গায়ে হলুদের মধ্য দিয়ে বিয়ে পর্ব শুরু হয়ে শুক্রবার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। ছেলের বাড়ি ভোলা জেলায় হলেও ঢাকার মিরপুর এলাকায় থাকেন তিনি। একটি রেস্টুরেন্টে শেফ হিসেবে কাজ করেন।
এদিকে নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার ব্যবসায়ী রুহুল আমিন রুবেল বলেছেন, এতিম কন্যা রাবেয়াকে বিয়ের মধ্য দিয়ে তিনি ১০৯তম বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন করলেন। সম্পূর্ণ নিজের খরচে এসব বিয়ে দিয়ে থাকেন তিনি। মানবিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে কাজটি করে যাচ্ছেন। সমাজের বিত্তবানদের এমন মানবিক কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
নড়াইলের ঈশানগাতী গ্রামে রাবেয়ার বিয়েতে বরযাত্রীসহ ১৫০ জনের আয়োজন ছিল বলে জানিয়েছেন রুহুল আমিন রুবেল। পাত্রীকে বরপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার সময় বিকালবেলা শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। কন্যার মাসহ আত্মীয়-স্বজনের আনন্দাশ্রুর সঙ্গে বৃষ্টির পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় বিয়ে বাড়ির আঙিনা।
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের মৃত মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে রুবেলের (৫০) রয়েছে অ্যাগ্রো ফার্ম ও ইলেকট্রনিক ব্যবসা। এ ছাড়া রয়েছে পৈতৃক সম্পত্তি। যা কাজে লাগিয়ে এমন মানবিক কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
মানবিক কাজ প্রসঙ্গে রুবেল জানিয়েছেন, ছোটবেলার একটি ঘটনার সূত্র ধরেই তিনি পরোপোকারী হয়ে ওঠেন। তার যখন সাত বছর বয়স, তখন তার মা পরনের একটি শাড়ি খুলে অসহায় এক নারীকে সাহায্য করেন। এতে অনুপ্রাণিত হন তিনি। মানসিক অবস্থার পরিবর্তন তখন থেকেই শুরু হয়। ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলে তিনি এলাকায় ছোট ছোট মানবিক কাজ শুরু করেন। এরপর ২০০২ সালে বড় পরিসরে মানবিক কাজে এগিয়ে আসেন। এলাকার একজন এতিম প্রতিবন্ধী মেয়েকে বিয়ে দিয়ে অসহায় পরিবারের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেন।
এভাবেই একে একে এতিম দরিদ্র পরিবারে নিজ খরচে বিয়ের কাজটি করে যাচ্ছেন রুবেল। প্রতিটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেন। ভবিষ্যতেও এমন কাজ চালিয়ে যেতে চান তিনি।
এ ব্যাপারে ঈশানগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রউফ মোল্যা বললেন, নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার ব্যবসায়ী রুহুল আমিন রুবেল এতিম অসহায় পরিবারগুলোর পাশ দাঁড়িয়ে ভালো কাজ করছেন। এটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তার মতো মানবিক মানুষ আরও সৃষ্টি হলে সমাজের অনেক অসাধ্য কাজ সাধ্যের মধ্যে চলে আসবে। অসহায় পরিবারগুলো দুঃখ-কষ্ট অনেকটা লাগব হবে।




