রংপুরে জুলাইয়ের ৬ হত্যা মামলায় দুই বছরেও নেই চার্জশিট

২৪ এর অভ্যুত্থান চলাকালে ১৯ জুলাই রংপুরে নিহত কলা ব্যবসায়ী মিরাজুল ইসলামের স্ত্রী ও দুই সন্তান। ছবি: আগামীর সময়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত ছয়জনের হত্যা মামলার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো মামলায় চার্জশিট দাখিল হয়নি। নিহতদের স্বজনরা দ্রুত বিচার দাবি করলেও মামলাগুলো ঘিরে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার না করলেও তদন্তে অগ্রগতির দাবি করেছে সিআইডি।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ-সহিংসতার সময় রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ছয়জন সাধারণ মানুষ। তাদের মধ্যে ছিলেন কলা বিক্রেতা, সবজি ব্যবসায়ী, অটোরিকশাচালক, স্বর্ণশ্রমিক, শ্রমিক ও শিক্ষার্থী।
নিহতদের একজন রংপুর নগরীর নিউ জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম। স্ত্রী, দুই ছেলে ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে ছিল তার সংসার। জীবিকার তাগিদে তিনি রংপুর সিটি বাজারে কলা বিক্রি করতেন। ১৯ জুলাই বিকালে আড়তে কলা বাছাই শেষে বের হওয়ার সময় জররেজ মার্কেটের সামনে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। গুলি তার বাম পাঁজরে বিদ্ধ হয়। স্থানীয়রা দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, রংপুরের ছয়টি হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, দলীয় নেতা এবং তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশের সাবেক ডিআইজি, পুলিশ সুপার, পুলিশ কমিশনার, সহকারী কমিশনার, ওসি, এসআইসহ শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
তবে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক বাদী পরে আদালতে হলফনামা দিয়ে উল্লেখ করেছেন, মামলায় থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা ও ব্যক্তির নাম তারা দেননি অথবা পরে জেনেছেন, তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। এসব হলফনামা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
নিহত মিরাজুল ইসলামের মা আম্বিয়া খাতুন জানিয়েছেন, কয়েকজন আইনজীবী তার বাসায় গিয়ে মামলা করার পরামর্শ দেন। মামলায় কাদের আসামি করা হয়েছে, সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই। পরে তিনি শুনেছেন, মামলায় ২১ জনের নাম রয়েছে, যাদের কাউকেই তিনি চেনেন না।
নিহত স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলনের স্ত্রী দিলরুবা বেগম ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। একই সঙ্গে অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
কাউনিয়ার নিহত মাহমুদুল হক মুন্নার বাবা আবদুল মজিদ ১২৮ জন, অটোরিকশাচালক মানিক মিয়ার মা নুরজাহান বেগম ১১৯ জন, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল তাহিরের বাবা আবদুর রহমান ৪০ জনের নাম উল্লেখ করেছেন।
পাশাপাশি ২০০ থেকে ৩০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় আসামি রাখা হয়েছে। নিহত সবজি ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেনের স্ত্রী জিতু বেগমও ৫৭ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি প্রায় ৩০০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করেছেন।
বাদীদের কয়েকজন স্বীকার করেছেন, মামলায় কাদের আসামি করা হয়েছে, সে বিষয়ে তারা পুরোপুরি অবগত নন। তাদের অনেককে পরে আদালতে হলফনামা দিতে বলা হয়েছে। তবে নিহতদের স্বজনদের দাবি, মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হোক।
রংপুরের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রইছ উদ্দিন বাদশা বলেছেন, মামলার পর ‘চিনি না’ বা ‘আসামি করিনি’ মর্মে হলফনামা দিলে তার আইনি মূল্য থাকে না। তবে এতে মামলার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তিনি জানান, এসব মামলা ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে এবং অনেক নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। চার্জশিট দাখিল হলেও বিচারকালে বাদীরা সাক্ষ্য না দিলে মামলা প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর মহানগরের সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক নাহিদ হাসান খন্দকার অভিযোগ করেছেন, হত্যা মামলাগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ আসামি নিরপরাধ। গুলি চালানো বা নির্দেশ দেওয়া কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি।
রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী জানিয়েছেন, মামলাগুলোর তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। একজন পুলিশ সদস্য আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের জন্য প্রয়োজনীয় লিখিত অনুমোদনের একটি অংশ পাওয়া গেছে। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের বিষয়ে অনুমোদনের অপেক্ষা রয়েছে। অনুমোদন মিললেই অল্প সময়ের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
হলফনামার বিষয়ে সুমিত চৌধুরী বলেছেন, এসবের আইনি কোনো মূল্য নেই। তদন্তের ভিত্তিতেই মামলার পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে।





