আইলার ১৭ বছর
আজও আশ্রয় সরকারি বাঁধ
- ১৫ থেকে ২০ হাজার পরিবার ভূমিহীন
- সরকারি জমিতে ৫ শতাধিক পরিবারের বাস
- টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় বৃষ্টিতেও শঙ্কা

‘তখন স্কুলে পড়ি। সেদিনের সেই কথা মনে হলে আজও গা শিউরে ওঠে। হঠাৎ কেমন যেন অন্ধকার হয়ে যায় আকাশটা। বাতাস বইতে শুরু করে শোঁ শোঁ শব্দে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশ থেকে শুনতে পাই মানুষের চিৎকার আর কান্নার আওয়াজ। বাঁধ ভেঙে গ্রামে হুহু করে ঢোকে নোনাপানি। বই-খাতা গোছানোর সময়টুকুও পাইনি। চোখের সামনে ভেসে যায় আমাদের চেনা গ্রামটা। হঠাৎ তলিয়ে যায় আমাদের বাড়িও। মায়ের সঙ্গে পানিতে ভাসতে ভাসতে আশ্রয় নিই একটি ঘরের চালে। এখন বড় হয়েছি। কিন্তু মে মাস এলেই সেই দিনটার কথা মনে পড়ে বুকটা কেঁপে ওঠে।’ ১৭ বছর আগের সেই স্মৃতি আজও দগদগে হয়ে আছে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের নাপিতখালী গ্রামের কবিরুল ইসলামের বুকে।
কবিরুলের মতো ২০০৯ সালের সেই বিভীষিকাময় ২৫ মে আজও ভুলতে পারেননি সাতক্ষীরা উপকূলের মানুষ। ওইদিনের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল মুহূর্তেই পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় গাবুরা, পদ্মপুকুর, আটুলিয়া আর মুন্সীগঞ্জের মানুষকে।
ঝড়ে পুরোপুরি লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সুন্দরবন-সংলগ্ন গাবুরা ইউনিয়ন। দ্বীপ ইউনিয়নটিতে প্রাণহানি ঘটে নারী-শিশুসহ ৩৯ জনের। শুধু শ্যামনগরেই গৃহহীন হন ২ লাখ ৪৩ হাজার ২৯৩ জন। ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের। রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে পড়েন হাজারো মানুষ।
ঘরবাড়ি হারিয়ে এখনো বেড়িবাঁধের কোল ঘেঁষে সরকারি জায়গায় বসবাস করছেন অনেকে। খাবার পানি ও কর্মসংস্থানের সংকটে অনেকে এলাকা ছেড়ে পাড়ি দিয়েছেন শহরে। কৃষক বা চিংড়ির ঘেরের মালিকদের অনেকে পরিবর্তন করেছেন পেশা। মাঝে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও নিত্যনতুন দুর্যোগে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছেন না তারা। গাবুরার স্থানীয় সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাউদার্ন চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের জরিপ, পাঁচ শতাধিক পরিবার বসবাস করছে নদীর চরে সরকারি জায়গায়।
আইলার পর সাতক্ষীরা উপকূলে স্থায়ীভাবে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য, শুধু গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নেরই ভিটেমাটি হারিয়ে সম্পূর্ণ বা আংশিক ভূমিহীন হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মানুষ। পরিসংখ্যানের হিসাবে ১৫ থেকে ২০ হাজার পরিবার। তেমনই ভূমি হারিয়ে আজও বেড়িবাঁধের পাশে আশ্রিত শাহিনুর ও আলেয়া দম্পতি। নদীর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে শাহিনুর রহমান জানালেন সেই ভয়াল দিনের কথা।
‘আইলার আগে এই খোলপেটুয়া নদীর তীরেই ছিল আমাদের সাজানো সংসার। বাপ-দাদার ২৫ বিঘা জমি ছিল। অভাব কাকে বলে, তা জানতাম না। কিন্তু আইলার এক রাতেই জমিদার থেকে এক নিমেষে আমাদের ফকির বানিয়ে দিল। ১৭ বছর ধরে বেড়িবাঁধের পাশে ঝুপড়ি ঘরে পড়ে আছি। কাজ না থাকায় এখনো এক বিঘা জমিও কিনতে পারিনি।’
স্থানীয় কামাল শেখের বর্ণনায় ভয়ংকর চিত্র, ‘ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবে ৯ নম্বর সোরা এলাকায় বাঁধ ভেঙে আব্দুল খালেকের চার বছর বয়সী ছেলে ওবায়দুল্লাহ পানিতে ভেসে মারা যায়। সেই ঘটনায় মারা যায় আব্দুল গফুরের তিন বছরের ছেলে আশরাফুল ও এক বছরের মেয়ে ফাতেমাও।
‘গাবুরার ভৌগোলিক অবস্থান, মাটির গুণাগুণ এবং জোয়ার-ভাটার প্রতিকূলতার কারণে কিছু কিছু জায়গায় কাজে কিছুটা সময় লাগছে। এ ছাড়া আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধসহ শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর, আটুলিয়া, বুড়িগোয়ালীনী ও মুন্সীগঞ্জের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর জন্য নতুন করে প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলেই জরাজীর্ণ বাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু হবে।’ জানান সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিভাগ-২) নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া ও বিভাগ-১-এর সহকারী প্রকৌশলী মো. নাহিদ আলম।
গাবুরা ইউপির চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম বলেছেন, আইলায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার অধিকাংশ এখনো পুরোপুরি সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। প্রায় এক হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। আইলার পর থেকে কর্মসংস্থানের সংকট আরও প্রকট হয়েছে। অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন জীবিকার সন্ধানে। এ ছাড়া নদীতে জোয়ারের পানি একটু বাড়লেই বেড়িবাঁধ ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। প্রতিটি বর্ষা আর প্রতিটি দুর্যোগের খবর এখনো এখানকার মানুষের মনে নতুন করে ভয় তৈরি করে।’
‘দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরাকে মডেল ইউনিয়ন ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে নতুন প্রযুক্তিতে বাঁধ তৈরির জন্য প্রায় ১ হাজার ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে কাজ চলছে। এ ছাড়া বাঁধের পাশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বনায়ন সৃষ্টির কাজ চলছে’— বলেছেন শ্যামনগর উপজেলা ইউএনও শামসুজ্জাহান কনক।
ভূমিহীনদের পুনর্বাসন ও সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল বলেছেন, ‘গাবুরায় টেকসই বাঁধের কাজ চলমান। বাকি এলাকাগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সংস্কারেও জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সমন্বয় করে কাজ করছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে বাঁধের ওপর বসবাস করছেন বা ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ঘর দেওয়া ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া সুপেয় পানির সংকট দূর করতে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প অব্যাহত রয়েছে।’
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আইলা থেকে শিক্ষা নিয়ে টেকসই বেড়িবাঁধ ও নদী সংরক্ষণ কাজে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার। এরই মধ্যে ৩৫ কিলোমিটার বাঁধকে স্থায়ী বাঁধে রূপান্তর করা হচ্ছে। বাকি বাঁধগুলো পর্যায়ক্রমে স্থায়ী করা হবে। এ বিষয়ে সংসদে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন।






