পদ্মা সেতু চালুর চার বছরেও দক্ষিণাঞ্চলে নেই প্রত্যাশিত শিল্পায়ন

সংগৃহীত ছবি
পদ্মা বহুমুখী সেতু। প্রায় চার বছর আগে চালু হয় স্বপ্নের এ সেতু। এটি চালুর পর খুলনাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজতর হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে সময় ও দূরত্ব। যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও বন্দর নির্ভর বাণিজ্যে সুফল দৃশ্যমান। তবে এসব খাতগুলোতে নতুন গতি সৃষ্টি হলেও প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ হয়নি, গড়ে ওঠেনি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, চালু হয়নি বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাও। ফলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা ছিল, তার পূর্ণ প্রতিফলন এখনো অপ্রত্যাশিত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের ডুমুরিয়া সদরের পূর্বপাশে গড়ে উঠেছে বৃহৎ কাঁচাবাজার। প্রতিদিন বাজার থেকে কমপক্ষে ১০০ টন সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়। এর মধ্যে ৮০ টন সবজি পদ্মা সেতু দিয়ে যায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে।
কাঁচাবাজার আড়ৎ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু চালুর আগে ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিবহণ আটকে থাকত। এতে দ্রুত পচনশীল শাক-সবজি নষ্ট হয়ে লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হতো। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারগুলোতে সবজি সরবরাহে অনীহা ছিল ব্যবসায়ীদের। বর্তমানে সেতুর কারণে কম সময়ে মাত্র পৌনে ৪ ঘণ্টায় ঢাকায় পণ্য পরিবহন সম্ভব হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েই লাভবান হচ্ছেন।
শুধু সবজি নয়, মাছ পরিবহনেও এসেছে গতি। খুলনা ও উপকূলীয় অঞ্চলের মাছ এখন সহজে ও দ্রুত সময়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন বাজারে পৌঁছাচ্ছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রপ্তানিও বেড়েছে। এতে মৎস্য চাষিদের উৎপাদনে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মৎস্য রপ্তানি নিয়ে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসকে কামরুল আলম বলেছেন, মোংলা বন্দরে সব সময় জাহাজ আসে না। অনেক সময় কনটেইনারও পাওয়া যায় না। যার কারণে কমপক্ষে ২০ ভাগ চিংড়ি ও মাছ পদ্মা সেতু হয়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রপ্তানি করা হয়। সেতু নির্মিত না হলে দীর্ঘ সময় জাহাজ ও কনটেইনারের জন্য বসে থাকতে হতো।
পদ্মা সেতুর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে পর্যটন খাতেও। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকদের আগমন বাড়ায় পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন। একই সঙ্গে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মোংলা ও ভোমরা স্থল বন্দরের গুরুত্বও বহুগুণ বেড়েছে।
তবে এত আশার মধ্যে হতাশাজনক বিষয় হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সত্ত্বেও খুলনা বিভাগে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে পদ্মাসেতু জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার পর খুলনা বিভাগে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন হয়, সেখানে বিনিয়োগ হয় ১ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধন হয়, বিনিয়োগ হয় ৭৫৭ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩টি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের বিপরীতে বিনিয়োগ হয়েছে ১ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা।
পদ্মাসেতু চালুর আগে পাঁচটি অর্থবছর অর্থ্যাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৭টি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন হয়, যেখানে বিনিয়োগ ছিল ১ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩৪টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন হয়, বিনিয়োগ হয় ১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন হয়, সেখানে ১১ হাজার ২২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়। এরপর ২০১৯-২০ অর্থবছরে নিবন্ধন হয় ১০টি প্রতিষ্ঠানের, বিনিয়োগ হয় ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩১টি প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়।
পরিসংখ্যাণের বরাত দিয়ে বিনিয়োগ বোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালু হলেও খুলনা বিভাগে প্রত্যাশা অনুয়ায়ী শিল্প গড়ে উঠছে না। প্রতি মাসে দুটি থেকে তিনটি ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধন নিচ্ছে। এসব শিল্পে সাধারণত ৫ থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ হচ্ছে। যা এ অঞ্চলের জন্য যথেষ্ট নয়।
জানতে চাইলে এ ব্যাপারে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি আশরাফ-উজ-জামান জানিয়েছেন, একসময় শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত খুলনায় অসংখ্য পাটকল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু একের পর এক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে অঞ্চলটি। কাজের সন্ধানে মানুষ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
তিনি বলেছেন, পদ্মা সেতু চালুর পর সবাই আশা করেছিল এ অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে। কিন্তু বাস্তবে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। খুলনা-বাগেরহাট-মোংলা ও খুলনা-সাতক্ষীরা-যশোর মহাসড়কের পাশে খালি জমিতে শুধুই কিছু সাইনবোর্ড দেখা যায়।
তার অভিমত, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে টিকে থাকতে উৎপাদন ব্যয় কমানো জরুরি। উৎপাদন ব্যয় কমানোর অন্যতম প্রধান উপাদান গ্যাস। কিন্তু খুলনা অঞ্চলে এখনো শিল্পে ব্যবহারের জন্য গ্যাস সরবরাহ নেই। নেই ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ বিশেষ করে অনৈতিক জোন। সে কারণে কাঙ্খিত শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়ছে না। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠছে না।
জুটমিল প্রসঙ্গে পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের সভাপতি কুদরত-ই-খুদা জানিয়েছেন, ক্রমাগত লোকসানের কারণে খুলনা বিভাগে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সর্বশেষ ২০২০ সালের জুলাইয়ে খুলনা অঞ্চলের ৯টিসহ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ কার্যকর করে সরকার। গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় শ্রমিকদের অবসায়নের প্রজ্ঞাপন খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি জুট মিলের নোটিস বোর্ডে টানিয়ে দেওয়া হয়। বন্ধ হওয়া ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল হচ্ছে ক্রিসেন্ট জুট মিল, প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল, খালিশপুর জুট মিল, দৌলতপুর জুট মিল, স্টার জুট মিল, ইস্টার্ন জুট মিল, আলিম জুট মিল, জেজেআই জুট মিল ও কার্পেটিং জুট মিল। মিলগুলো বন্ধ ঘোষণায় চাকরি হারান স্থায়ী-অস্থায়ী প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক।
কুদরত-ই-খুদা বলেছেন, শ্রমিকরা আশা করেছিল পদ্মা সেতু চালু হলে ফের জি টু জি বা বিদেশি বিনিয়োগ বা পাবলিক পাইভেট পাটনারশিপে মিলগুলো চালু হবে, শ্রমিকরা ফের খুলনায় ফিরে আসবে। কিন্তু সরকারের নীতির কারণে সেটি হয়নি। যদিও ২০২১ সালের এপ্রিলে সরকার পাটকলগুলোকে বেসরকারি খাতে ৫ থেকে ৩০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে কয়েকটি ইজারা দেওয়া হলেও ইজারা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো উৎপাদনে যেতে পারেনি। ব্যাংক লোন নেওয়ার জন্য তারা লোক দেখানো উৎপাদন করছে। এতে উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না।





