২১ মাসে বান্দরবানে চার জেলা প্রশাসক, বদলি নিয়ে আলোচনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পার্বত্য জেলা বান্দরবানে গত ২১ মাসে চারজন জেলা প্রশাসক দায়িত্ব পালন করেছেন। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মাথায় বদলি করা হয়েছে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সানিউল ফেরদৌসকে। তার শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত পরিচালক নাজনীন সুলতানাকে।
স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একের পর এক জেলা প্রশাসকের বদলি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
এর আগে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শামীম আরা রিনি। তার মেয়াদও ছিল মাত্র ১৪ মাস। এই সময়ে তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকারের অধীনে কাজ করেছেন। এ সময়ের মধ্যেই তাকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে হয়।
বান্দরবান জেলা প্রশাসনের তথ্য বাতায়নের রেকর্ড অনুযায়ী, শামীম আরা রিনির আগে জেলা প্রশাসক ছিলেন শাহ মুজাহিদ উদ্দিন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বও পালন করতে হয়েছিল তাকে। পাশাপাশি জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম পাঁচ মাসের ঘটনাবহুল সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বান্দরবানের সাবেক জেলা প্রশাসক বলেন, এই চারজন জেলা প্রশাসককে কাজ করতে হয়েছে তিনটি সরকারের অধীনে। এটিও একটি রেকর্ড।
জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সাধারণত একজন কর্মকর্তাকে জেলা প্রশাসক পদে দুই থেকে আড়াই বছর দায়িত্বে রাখা হয়। তবে কখনো কখনো স্বাভাবিক কারণেও এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে।
বান্দরবান জেলা প্রশাসনের তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, ১৯৮১ সালে স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে বান্দরবানের যাত্রা শুরু হয়। ওই বছরের ১৬ জুন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ফারুক আহমদকে নবগঠিত জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি এ পদে সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় জেলা প্রশাসক আবদুল লতিফও প্রায় ৪০ মাস দায়িত্বে ছিলেন। পঞ্চম জেলা প্রশাসক দায়িত্ব পালন করেন প্রায় ৪৩ মাস। আতিকুল ইসলাম চৌধুরীও তিন বছর এ পদে ছিলেন।
অন্যদিকে বিষ্ণুপদ সাহা বান্দরবানের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাত্র চার মাস। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কানাডায় পাড়ি জমান।
জেলা প্রশাসনের সাবেক কর্মচারী আবদুল মান্নান বলেন, ‘বান্দরবানে সবচেয়ে কম সময় দায়িত্বে ছিলেন বিষ্ণুপদ স্যার। মেয়াদ মাত্র চার মাসের হলেও দক্ষতার কারণে তিনি বেশ জনপ্রিয় জেলা প্রশাসক ছিলেন।’
তার ভাষ্য, অল্প সময় দায়িত্ব পালনের পর তার বিদায়ের পেছনে কোনো নেতিবাচক কারণ ছিল না। উচ্চশিক্ষার জন্যই তিনি কানাডায় গিয়েছিলেন।
জেলা প্রশাসনের রেকর্ড অনুযায়ী, স্বল্প সময় দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যে রয়েছেন মওদুদ এ কে কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদে সাড়ে সাত মাস দায়িত্ব পালন করেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় তিনি হঠাৎ বান্দরবানের জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বদলি হয়ে চলে যান।
আরেক স্বল্পমেয়াদি জেলা প্রশাসক ছিলেন আসলাম হোসেন চৌধুরী। তিনি মাত্র পাঁচ মাস দায়িত্ব পালন করেন। তবে তার ক্ষেত্রেও বদলির পেছনে কোনো নেতিবাচক কারণ ছিল না। বান্দরবান থেকে তাকে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বদলি করা হয়।
এ বিষয়ে আসলাম হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘মর্যাদার দিক থেকে কুষ্টিয়া অনেক এগিয়ে। তাই এই বদলিকে পুরস্কার হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবানের জেলা প্রশাসকদের বদলি নিয়ে আলোচনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে শাহ মুজাহিদ উদ্দিন ও শামীম আরা রিনির বদলিকে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্বাভাবিক বদলির অংশ হিসেবে শাহ মুজাহিদ উদ্দিনকে সচিবালয়ে নেওয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন শামীম আরা রিনি।
স্থানীয় ও জেলা প্রশাসনসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দক্ষতার সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই তাকে বদলি করে। বান্দরবানে তিনি ১৪ মাস দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়ে সানিউল ফেরদৌস সময় পেয়েছেন মাত্র ৬ মাস ছয় দিন। তার ও শামীম আরা রিনির বদলির বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে শাহ মুজাহিদ উদ্দিন এ বদলিকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘সাধারণত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশব্যাপী বড় ধরনের বদলি ও নতুন পদায়ন হয়। এটি যেকোনো সরকারের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমি এতে নেতিবাচক কিছু দেখছি না।’



