দেড়শ বছরের ঐতিহ্য
কালীগঞ্জে ঈদের মাংস পৌঁছে যায় প্রতিটি ঘরে

ছবি: আগামীর সময়
গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া গ্রামে ঈদুল আজহা মানেই এক ব্যতিক্রমী সামাজিক আয়োজন। প্রায় দেড়শ বছর ধরে চলে আসা এই রীতিতে কোরবানির মাংস সমানভাবে বণ্টন করা হয় গ্রামের প্রতিটি পরিবারের মধ্যে। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ছাড়াই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার এই ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছেন গ্রামের মানুষ।
ঈদের দিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। গ্রামের ঈদগাহ মাঠজুড়ে শুরু মাংস ভাগাভাগির ব্যস্ততা। কোরবানি দেওয়া পরিবারগুলো নিজেদের পশুর মাংসের একটি অংশ জমা দেন সম্মিলিত বণ্টনের জন্য। পরে স্বেচ্ছাসেবকদের তত্ত্বাবধানে সেই মাংস সমানভাবে ভাগ করে পৌঁছে দেওয়া হয় প্রতিটি ঘরে, বিশেষ করে যেসব পরিবার কোরবানি দিতে পারেনি তাদের কাছেও।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই আয়োজন শুধু মাংস বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি গ্রামের সামাজিক বন্ধন অটুট রাখার এক অনন্য উদাহরণ। ঈদের আগের দিন থেকেই তরুণরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টোকেন বিতরণ করেন। তালিকা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয় প্রতিটি পরিবারের অংশ। ঈদের দিন দুপুরের পর টোকেন হাতে মানুষ ভিড় করেন ঈদগাহ মাঠে। সেখানে স্বেচ্ছাসেবকেরা মাংস কাটা, ওজন করা ও ভাগ তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকেন।
গ্রামের তরুণ রাকিবুল হাসান শিশির জানিয়েছেন, কয়েকজন বন্ধু মিলে স্বেচ্ছায় পালন করছেন এই দায়িত্ব। ‘এই আয়োজন শুধু মাংস বণ্টন নয়, এটি আমাদের গ্রামের মিলনমেলা। সবাই একসঙ্গে কাজ করি, হাসি-আনন্দ ভাগাভাগি করি। ভবিষ্যতে আমাদের ছোট ভাইয়েরাও হয়তো এই দায়িত্ব নেবে।’
গ্রামের বাসিন্দা মো. নূর আলম সরকারের ভাষ্য, এটি কেবল একটি প্রথা নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। ‘আগে যৌথ পরিবার ছিল বেশি। এখন পরিবার ছোট হয়ে গেছে, মানুষও আলাদা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই আয়োজন এখনও মানুষকে ধরে রেখেছে একত্রে।’
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রায় ৩০০টি ভাগ তৈরি করা হয়েছে। গ্রামের বিধবা, প্রতিবন্ধী ও অসচ্ছল পরিবারগুলোর জন্যও রাখা হয়েছে বিশেষ বরাদ্দ। স্থানীয় মসজিদ থেকে মাইকিং করে বিকেলের মধ্যেই সম্পন্ন করা হয় পুরো বণ্টন কার্যক্রম।
মদিনাতুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ইনজামুল হক জাকির জানিয়েছেন, গ্রামের মানুষ কোরবানির পশুর মাংসের তিন ভাগের একভাগ সামাজিক বণ্টনের জন্য জমা দেন। এরপর কোরবানি করেননি এমন প্রতিটি পরিবারে সেই মাংস পৌঁছে দেওয়া হয়।
ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি রফিজ উদ্দিন বলেছেন, ‘এই রীতি আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকে চলে আসছে। এক সময় বাপ-চাচারা দায়িত্ব পালন করতেন, পরে আমরা করেছি। আর এখন তরুণরা করছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরেক প্রজন্ম এটি ধরে রাখবে, এটাই আমাদের আশা।’
তিনি আরও জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো কোরবানির দিনে গ্রামের কোনো পরিবার মাংস পাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকে না।
ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতি আরিফুল ইসলামের দাবি, এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে ইসলামের সৌন্দর্য। ‘এখানে সবাই সমান। ধনী-গরিব, ছোট-বড় কোনো পার্থক্য নেই। এমনকি অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের কথাও আলাদা করে ভাবা হয়। এটাই তো প্রকৃত সামাজিক সম্প্রীতি।’
সময়ের সঙ্গে গ্রামের চেহারা ও মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এলেও ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়ার মানুষ এখনো ধরে রেখেছেন শতাব্দীপ্রাচীন সেই মানবিক ঐতিহ্য। যেখানে ঈদের আনন্দ শুধু নিজের ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না, ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজে।






