হাইটেক চীনে, সানসেট চট্টগ্রামে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘ চার দশক ধরে ‘বিশ্ব কারখানা’ হিসেবে পরিচিত চীন তাদের শিল্পনীতিতে এনেছে বড় পরিবর্তন। যেসব শ্রমঘন শিল্পের ওপর ভর করে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঘটেছিল, সেগুলোতে মুনাফা বেশ কমে গেছে। অর্থনীতির ভাষায় এগুলোকেই বলে ‘সানসেট ইন্ডাস্ট্রি’। সেসব শিল্প অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছে। আর নিজেদের মাটিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ইলেকট্রিক গাড়ি ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো উচ্চপ্রযুক্তির বা হাইটেকনোলজি শিল্পের নতুন ভবিষ্যৎ গড়ছে বেইজিং। কয়েক বছর থেকেই ধীরে ধীরে সানসেট ইন্ডাস্ট্রি সরিয়ে নিতে শুরু করেছে চীন। এই তালিকায় ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের বদলে এখন বেইজিংয়ের পছন্দ হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগরের তীরে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও আসিয়ানের মতো দেশ থাকতে বেইজিংয়ের প্রথম পছন্দ কেন চট্টগ্রাম হয়ে উঠল, সেই আলোচনাও সামনে এসেছে।
বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগে ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকার চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন নির্মাণকাজ শুরুর পর এই আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ওই ইকোনমিক জোনের অবকাঠামো নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। যেখানে এক লাখ লোকের কর্মসংস্থানের কথা বলা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জার্নাল ও প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বিশ্লেষণ করলে চট্টগ্রামকে বেছে নেওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ স্পষ্ট। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের আগামী দিনের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক ছক মেলানোর সবচেয়ে বড় কৌশলগত চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা এই আনোয়ারা।
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানিয়েছেন, চীনের কারখানা স্থানান্তরের বড় গন্তব্য চট্টগ্রাম হয়ে ওঠা সত্যিই গৌরবের। নির্ধারিত সময়ে সেই অর্থনৈতিক অঞ্চলের গ্যাস, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে এই প্রকল্প অর্থনৈতিক গেম চেঞ্জার হয়ে উঠবে। অন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনুপ্রাণিত করবে।
প্রধানত চার কারণে চীন তাদের সানসেট ইন্ডাস্ট্রি সরিয়ে নিচ্ছে। প্রথমত, দেড় দশকে কারখানা শ্রমিকের গড় মজুরি তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। সেখানে সস্তা পণ্য বানিয়ে আর উচ্চ মুনাফা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের ‘এক সন্তান নীতি’র কারণে তরুণ কর্মক্ষম শ্রমিকের সংকট তৈরি হয়েছে এবং বয়স্ক চীনা নাগরিকের সংখ্যা বেড়েছে। তৃতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মতো বেশি মুনাফার হাইটেক শিল্পায়নে প্রাধান্য দিচ্ছে। চতুর্থত, পরিবেশদূষণ কমাতে ভারী ও দূষণকারী কারখানার ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়েছে সে দেশে।
২০১২-১৫ সালের মধ্যে চীন তার সানসেট ইন্ডাস্ট্রি ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ার মতো আসিয়ান দেশগুলোতে পাঠাতে শুরু করে। পরে সেখানে খরচ বাড়লে আফ্রিকার ইথিওপিয়া, কেনিয়া ও ভারতে নিতে শুরু করে।
বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, চীনের সানসেট ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত ৮ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত শিল্পকারখানা বিভিন্ন দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এর মধ্যে পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, জুতা, সস্তা ইলেকট্রনিকস ও টেক্সটাইল খাতের প্রায় ৮৫টি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরির কারখানা অন্তর্ভুক্ত।
আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন জার্নালগুলোর বিশ্লেষণ বলছে, ভিয়েতনামে বর্তমানে শিল্প জমির দাম ও মজুরি দ্রুত বাড়ছে এবং দামি পণ্য উৎপাদনে নজর বেড়েছে। অন্যদিকে, প্রচুর সস্তা শ্রমশক্তি, বিশাল অভ্যন্তরীণ পোশাক খাত এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘমেয়াদি ‘শিল্প হাব’ হিসেবে বাংলাদেশ ভিয়েতনামের চেয়ে দ্রুত এগিয়েছে। তাই নজর কেড়েছে চীনের।
বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বার্ষিক মোট রপ্তানি ৪০ থেকে ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একটি পোশাক তৈরির মোট ব্যয়ের গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশই চলে যায় কাঁচামাল আমদানিতে। আমদানির ৫০ শতাংশই চীন থেকে আসে।
চায়না ইকোনমিক জোন স্থাপনের প্রশংসা করে বিজিএমইএর সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুস সালাম জানালেন, এই উদ্যোগ আরও বিনিয়োগ আনবে। কর্সংস্থান বাড়াবে। অর্থনীতিকে গতিশীল করবে। দ্রুত কাঁচামাল আসার সুযোগ তৈরি হবে।
কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে প্রায় ৮০০ একর জমিতে চায়না ইকোনমিক জোন একেবারে প্রাইম লোকেশনে। সেখান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে সড়কপথে কর্ণফুলী টানেল হয়ে যেতে ২০ মিনিট। নদীপথে চট্টগ্রাম বন্দরে যেতে লাগবে আরও কম সময়। এই জোন থেকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর একেবারে কাছে। আর চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হাতের নাগালে। নদী, সাগর, আকাশ, সড়ক মিলিয়ে এত দারুণ সুবিধা আশপাশের কোনো ইপিজেড বা ইকোনমিক জোনে নেই।
আনোয়ারায় কারখানা স্থানান্তরে মজুরি ও জমি বাবদ চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং খরচ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যাবে বলে ফিজিবিলিটি স্টাডিতে বলা আছে। চীনের সমুদ্রবন্দরের বদলে চট্টগ্রামের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর দিয়ে পণ্য আমেরিকা-ইউরোপে রপ্তানিতে সময়-খরচ অনেক কম লাগবে। আর পশ্চিমা দেশগুলো যখন চীনকে শুল্কসহ নানাভাবে পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা বা কড়াকড়ি দেয়, তখন সেই ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত ও স্বল্প শুল্ক সুবিধা নিয়ে সেই গন্তব্যে পাঠানোর সুযোগ পাবে চীন।
এ ছাড়া চায়না ইকোনমিক জোনে পোশাক কারখানার কাঁচামাল উৎপাদন করে দ্রুত সরবরাহ দেওয়া গেলে দেশের ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক খাতের সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণের বিশাল সুযোগ চীনের হাতেই থাকবে।




