যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ : ফ্লাইট বাড়ল যাত্রী কমল চট্টগ্রামে

বিমানের ককপিট— মাজেদ চৌধুরী
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চট্টগ্রামের ‘শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে’ আর্ন্তজাতিক যাত্রী পরিবহনে অদ্ভুত এক বৈপরীত্য দেখা গেছে। সাধারণ নিয়মে ফ্লাইট বাড়লে যাত্রী সংখ্যা বাড়ার কথা, এখানে ঘটেছে ঠিক উল্টো। গত বছর প্রতি মাসে ৮৩ হাজার যাত্রী যাতায়াত করলেও এবার গড়ে কমেছে সাড়ে ৮ হাজার।
বছরের প্রথম পাঁচ মাসে এই বিমানবন্দর দিয়ে নতুন করে কোন এয়ারলাইনস যাত্রা শুরু করেনি। কার্যক্রম বন্ধও করেনি। বিদ্যমান এয়ারলাইনসই আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়িয়েছে। কিন্তু ক্রমান্বয়ে কমেছে যাত্রীর সংখ্যা। ফলে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক কম যাত্রী পরিবহন করছে এয়ারলাইনসগুলো।
বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে মূলত ৫টি এয়ারলাইনস আন্তর্জাতিক রুটে নিয়মিত যাতায়াত করছে। এর মধ্যে রয়েছে— রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, বেসরকারী ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, দুবাইভিত্তিক ফ্লাই দুবাই, শারজাহভিত্তিক এয়ার অ্যারাবিয়া ও ওমানভিত্তিক সালাম এয়ার।
চট্টগ্রাম থেকে এক মাসে সবচেয়ে বেশি ১৯০ ফ্লাইট পরিচালনা করছে এয়ার অ্যারাবিয়া। শারজাহ এবং আবুধাবিতে তাদের যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা মাসে ৩৮ হাজার। প্রতিষ্ঠানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণেই এই বিপরীত চিত্র তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের কারণে অনেক প্রবাসীকে দেশে ফেরত আসতে হয়েছে। নতুন করে কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে চাকরির জন্য যেতে পারেনি। প্রবাসীরা ঈদের সময় দেশে এলেও ফেরত যাননি যুদ্ধভীতির কারণে। ফলে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। একমুখী যাত্রী পরিবহন চলছে এখন। যা আগে কখনো ছিল না।
যাত্রী কমে গেলেও এয়ারলাইনসগুলো ফ্লাইট সংখ্যা কমায় না কেন। এমন প্রশ্নের উত্তরে সিনিয়র কর্মকর্তা সোহেল মজিদ বলছেন, ‘হুটহাট করে ফ্লাইট সংখ্যায় তারতম্য হলে বাজারে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। কোন রুটে কয়টি উড়োজাহাজ চলবে সেটি আগে থেকে নির্ধারণ করা থাকে। লাভ-ক্ষতির হিসাব করেই তখন ফ্লাইট শিডিউল ঘোষণা করে এয়ারলাইনসগুলো।’
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ৬০৭টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাত্রী যাতায়াত করেছিল ৮৫ হাজার। ফেব্রুয়ারি মাসে ফ্লাইট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩০টি। অথচ যাত্রী সাড়ে ১৩ হাজার কমে দাঁড়ায় সাড়ে ৭১ হাজার। মার্চ মাসে ফ্লাইটের সংখ্যা আরও বেড়েছে ৪১টি। এক লাফে এতো ফ্লাইট বাড়লেও সে তুলনায় যাত্রী বাড়েনি। ৪১ ফ্লাইটের বিপরীতে বেড়েছে ৩ হাজার অর্থাৎ সাড়ে ৭৪ হাজার।
গত এপ্রিল মাসে ফ্লাইট সংখ্যা বছরের সর্বোচ্চ ৬৮৫টি। বিপরিতে যাত্রী কমে দাঁড়ায় ৭৩ হাজার ৭২৯ জনে। সর্বশেষ মে মাসে ৬৫২টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাত্রী নেমে আসে সর্বনিম্নে— মাত্র ৬৭ হাজার ৭৬৫ জনে।
বিমানবন্দরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, জানুয়ারি মাসে প্রতি ফ্লাইটে যেখানে গড়ে ১৪০ জন যাত্রী ভ্রমণ করেছিলেন, সেখানে এপ্রিলে ১০৭ জন এবং মে মাসে তা মাত্র ১০৩ জনে নেমে আসে। প্রতিটি ফ্লাইটের ধারণক্ষমতা ১৭২ থেকে ৪২০ জন।
আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী কমার পেছনে আরেকটি কারণ ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ। ওই সময় চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১৭৪টিরও বেশি ফ্লাইট সাময়িকভাবে বাতিল বা রিসিডিউল করতে হয়। এই অস্থিতিশীলতার কারণে হাজারো নিয়মিত প্রবাসী শ্রমিক ও ব্যবসায়ী তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল বা স্থগিত করেন।
তবে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের মুখপাত্র প্রকৌশলী ইব্রাহিম খলিল বলছেন, ‘৫ মাসের তথ্য দিয়ে বিমানবন্দরের আসল চিত্র জানা যাবে না। আমাদের যাত্রী-ফ্লাইট উঠানামা বাড়ে মূলত শীতকালে। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত আমাদের ফ্লাইট উঠানামা ২৪ ঘন্টাও খোলা থাকে। এখন সাড়ে ৫টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা ফ্লাইট উঠানামার পর্যবেক্ষণ টাওয়ার চালু থাকে। এছাড়া মে থেকে জুন মাসে অনেকগুলো হজ ফ্লাইট চলেছে, সেই তথ্য যোগ হলে যাত্রী সংখ্যা আরও বাড়বে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে— এই ৫ মাসে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট ৩ লাখ ৭২ হাজার ৮৩৮ জন আন্তর্জাতিক যাত্রী আসা-যাওয়া করেছেন। প্রতিমাসে এই সংখ্যা সাড়ে ৭৪ হাজার জন। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বছরশেষে যাত্রী আসা-যাওয়ার সংখ্যা দাঁড়াবে ৮ লাখ ৯৫ হাজার জনে। কিন্তু ২০২৫ সালে এই বিমানবন্দর দিয়ে শুধু আর্ন্তজাতিক যাত্রী আসা-যাওয়া করেছে প্রায় ১০ লাখ। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ২১ হাজার জন।





