‘আন্দোলনে অন্ধ হলাম, দেশটাও দেখি অন্ধকারে’

গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় সেই ক্যানভাসগুলো এখন অনেকটাই বিবর্ণ।
বন্দুকের সামনে দুই হাত মেলে ধরে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদ কিংবা ‘পানি লাগবে, পানি’ বলতে বলতেই বুক বিদীর্ণ করা গুলিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মুগ্ধ। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ‘মুখ’ ছিলেন যেন তারা। যাদের ছবি আর গ্রাফিতিতে ভরে উঠেছিল বন্দরনগরীর দেয়ালগুলো। শুধু মুগ্ধ বা আবু সাঈদই নন, শহরের দেয়ালে দেয়ালে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এঁকেছিলেন জুলাই আন্দোলনের রক্তাক্ত দিনের গল্পগাথা। সেখানে ছিল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন, ছিল সুন্দর দেশ গড়ার প্রত্যয়।
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় সেই ক্যানভাসগুলো এখন অনেকটাই বিবর্ণ। গতকাল মঙ্গলবার নগরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেল, কোথাও বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে রঙ চটে যাওয়া ক্যানভাসে। কোথাও ধুলোবালি জমে আবছা হয়ে এসেছে রক্তিম স্লোগানগুলো। কোনো কোনো দেয়াল স্মৃতির ক্যানভাসেও আর ধরা দেয় না।
কথা হলো এই আন্দোলনে চট্টগ্রামে নিহত হওয়া ‘জুলাই শহীদদের’ পরিবার, আহত ও সম্মুখসারির কর্মীদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে হতাশা আছে, নানা অভিযোগও আছে। কিন্তু ক্ষয়ে যাওয়া দেয়ালের রঙ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ফিকে হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না— এমন সংশয়ের সঙ্গে দ্বিমত রয়েছে তাদের। তারা মনে করেন, সাময়িক ক্যানভাস হিসেবে দেয়ালের রঙ ফিকে হয়ে যেতেই পারে। কিন্তু মানুষের মন থেকে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি ও রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগের গল্প সহজে মুছে যাবে না।
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ভোর থেকে নগরীর সার্সন রোড, লালখান বাজার মোড়, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, টাইগারপাস, জামালখানসহ চট্টগ্রাম নগর জুড়ে রঙতুলি হাতে নেমেছিলেন হাজারো শিক্ষার্থী। চট্টগ্রাম গ্রামার স্কুলের (সিজিএস) মতো অভিজাত ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা রঙিন করেছিলেন সার্সন রোডকে। অনেক ব্যবসায়ী-শিল্পপতি-অভিভাবক, যাদের খালি চোখে দেখা পাওয়া দুষ্কর, তারাও সেদিন সব সন্তানের জন্য খাবাবের ব্যবস্থা করেছিলেন। দিয়েছিলেন রঙতুলি কেনার অর্থ। এই সম্মিলিত আবেগ থেকেই নগরের দেয়ালগুলো হয়ে উঠেছিল নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের জীবন্ত দলিল।
এর আগে ১৬ জুলাই উত্তাল চট্টগ্রামের মুরাদপুরে নিহত হয়েছিলেন কলেজছাত্র ফয়সাল আহমেদ শান্ত। তার মা স্কুলশিক্ষিকা কোহিনূর বেগম দুই বছর পর এসে দেখছেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হওয়াদের নিয়েই রাষ্ট্র বিভিন্ন বৈষম্য করছে। এই মা দায়ী করলেন চব্বিশের পর থেকে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আছেন তাদের।
কোহিনূর বেগম বলছিলেন, ‘আমাদের সন্তানদের শাহাদাতবরণ নিয়েও বৈষম্য শুরু হয়েছে। যেসব শহীদের পরিবার দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তাদের নাম সবখানে আছে। আর আমরা যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই, আমাদের মাইনাস করা হচ্ছে। ওয়াসিম আর আমার ছেলে শান্ত শহীদ হয়েছে ১৬ জুলাই। মুগ্ধ শহীদ হয়েছে ১৮ জুলাই। কিন্তু সবখানে আবু সাঈদ, ওয়াসিম আর মুগ্ধর নাম বলা হয়। শান্তর নাম কোথাও নেই। সালাম, বরকত, রফিক জব্বার— একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদদের নাম যদি এভাবে একসঙ্গে উচ্চারিত হতে পারে, তাহলে চব্বিশের শহীদদের নাম কেন এভাবে আসবে না?’
১৬ জুলাই আন্দোলনের মাঠ থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন চট্টগ্রাম জেলা ছাত্র ইউনিয়নের তিন নেতা। তাদের একজন শুভ দেবনাথ বললেন, ‘চট্টগ্রামে ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে আমরাই প্রথম গ্রেপ্তার হই। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান শেষ হওয়ার পর দেখলাম আমাদের ক্রমাগতভাবে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের মালিকানা কুক্ষিগত করে ফেলল ডানপন্থীরা। চব্বিশকে মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। চব্বিশের গণআন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার যে বাস্তবায়ন হলো না, সেজন্য সুযোগসন্ধানী প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলো দায়ী। ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।’
আন্দোলনে গিয়ে ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র শুভ হাসান। তিনি বলছিলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে জুলাই আন্দোলনে গিয়েছিলাম। সেই আশা ক্ষীণ হতে হতে এখন শেষপ্রান্তে। আন্দোলন করতে গিয়ে অন্ধ হয়ে গেলাম। এখন দেখছি দেশটাও অন্ধকারে। মাঝখান থেকে কিছু মানুষের পকেট ভরল।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের চট্টগ্রাম জেলার সহসভাপতি পুষ্পিতা নাথ ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে সামনের কাতারে। ‘জুলাই আন্দোলনের’ আশা-আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। মববাজি, সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, ক্যাম্পাসে মারামারি, চাঁদাবাজি, হামলা-মামলা সব ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ওপর ভর করে যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তারা জনআকাঙ্ক্ষার পথে হাঁটেননি। নির্বাচিত সরকারও হাঁটছে না। দেশে খুন, ধর্ষণ, নিপীড়ন, প্রতিক্রিয়াশীলদের উত্থান ব্যাপক আকারে ঘটেছে।’
১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুরে নিহত হয়েছিলেন ফার্নিচার দোকানের কর্মী মোহাম্মদ ফারুক। এক ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে কোনোমতে দিন কাটছে তার বিধবা স্ত্রী সীমা আক্তারের। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, ‘স্বামী হারিয়ে যে অন্ধকারে পড়েছি, সেই অন্ধকারেই আছি। কারও ওপর কোনো অভিযোগ নেই। কারও ওপর কোনো ক্ষোভও নেই। সবকিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’
জুলাই আন্দোলনের গর্ভে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল এনসিপির চট্টগ্রাম নগরের সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন বললেন, ‘দেশ ৫ আগস্টের আগের সিস্টেমে ফিরে গেছে। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের বিচারটা শক্তভাবে করা দরকার ছিল। না হয় রিকনসিলিয়েশনের মাধ্যমে ফেরার সুযোগ দাও। কিন্তু বিএনপি কোনোটাই করছে না। বরং তাদের নানাভাবে ট্যাগ দিয়ে, মামলা বাণিজ্য করে, ব্যবসা দখল করে, চাঁদাবাজি করে তাদের ফিরে আসার পথ তৈরি করে দিচ্ছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক শরীফুজ্জামান শরীফ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলছিলেন, ‘যেকোনো দেশে অভ্যুত্থানের পর তারা রাজনীতি, সামাজিক মূল্যবোধ, অর্থনীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা ও সুযোগ গ্রহণ করে। কিন্তু আমাদের এখানে অভ্যুত্থানের একপক্ষ একাত্তরের পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলার উপলক্ষ হিসেবে নিয়েছে। আরেকপক্ষ চাঁদাবাজির স্বাধীনতা হিসেবে নিয়েছে। দুর্নীতির অবসান, ভোটাধিকার, সুশাসন ফাঁকা বুলি হয়ে রয়ে গেল।’




