প্লাস্টিক কুড়িয়ে সম্মাননা পেলেন আজাদ ও শাহিনা

ছবি: আগামীর সময়
আবুল কালাম আজাদ। বয়স ৬২। ছিলেন প্রবাসী। আট বছর আগে ব্রেইন স্ট্রোকের পর শরীরের একাংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। আর্থিকভাবেও হয়ে যান নিঃস্ব। অন্য কোনো উপায় না পেয়ে শুরু করেন প্লাস্টিক কুড়ানো। জীবিকার তাগিদে টোকাইয়ের কাজ বেছে নিলেও সেই পেশায় এনে দিয়েছে সম্মাননা। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবদানের জন্য তিনিসহ চারজন পেয়েছেন এই সম্মাননা।
গবেষণা বলছে, আবুল কালাম আজাদদের হাত ধরে পরিবেশ রক্ষার এক নীরব বিপ্লব ঘটছে চট্টগ্রামে। এখানে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যের ৭৩ শতাংশই সংগ্রহ করেন তারা।
প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ‘প্রথম যখন টোকাইয়ের কাজ শুরু করি, তখন মুখ ঢেকে বোতল ও পলিথিন কুড়াতাম। এখন এই কাজ দিয়ে শুধু আমার পরিবার চলছে না, আমি সমাজে সম্মানিতও হয়েছি। এটা আমার জীবনের একটা আনন্দের মুহূর্ত।’
গতকাল সোমবার দুপুরে নগরীর পাঁচ তারকা হোটেলে দুজন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রাহক ও দুজন ভাঙারি দোকানির হাতে সম্মাননার ক্রেস্ট তুলে দেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে ইউনিলিভার বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা)।
এই তিন প্রতিষ্ঠান নগরীতে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদারে কাজ করছে। অনুষ্ঠানে তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অংশীদারত্ব আরও দুই বছরের জন্য নবায়ন করা হয়। এ উপলক্ষে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়।
সম্মাননা পাওয়া অন্য তিনজন হলেন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহকারী শাহিনা আক্তার এবং ভাঙারি দোকানি আব্দুর রশিদ ও মনোয়ারা বেগম।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এই উদ্যোগের আওতায় নগরীতে গত প্রায় চার বছরে ৩২ হাজার টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল ফ্লেক্সিবল প্লাস্টিক। ২০২২ সালের জুন থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় এই বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
উদ্যোগটির মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ভাঙারিওয়ালা ও রিসাইক্লারদের একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বল্পমূল্যের প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহে প্রণোদনাভিত্তিক মডেল চালু করা হয়েছে।
মেয়র শাহাদাত হোসেন জানালেন, নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করতে সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। এ ধরনের উদ্যোগ পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গঠনে সহায়ক হবে।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস খান বললেন, প্লাস্টিক বর্জ্য সমস্যা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। চলমান অংশীদারত্ব বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও বর্জ্যকর্মীদের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইপসার প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আরিফুর রহমানের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা আরও সংগঠিত ব্যবস্থার আওতায় আসছেন। এতে তাদের আয়, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্বীকৃতি বাড়ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এক বছর ধরে গবেষণা করেন। সে অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর ৫০ লাখের বেশি বাসিন্দা বছরে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯১৩ মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৭৯ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করেন সংগ্রহকারীরা, যা উৎপাদিত বর্জ্যের প্রায় ৭৩ শতাংশ। যেখানে সারা বিশ্বে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের হার ৯ শতাংশ। চট্টগ্রামে এ কাজে জড়িত আছেন প্রায় ২০ হাজার ৫০০ শ্রমিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।




