গার্মেন্টে সুতা আমদানি শুল্ক সুবিধা বন্ধে বাড়তি খরচ ৭ হাজার কোটি টাকা
- গার্মেন্টে সুতা আমদানির শুল্ক সুবিধা বন্ধ
- পোশাক তৈরিতে ৬০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় এক ধরনের সুতা
- একই সুতা আমদানি করতে হচ্ছে ৪০ শতাংশের বেশি শুল্কে

দেশে পোশাক তৈরিতে ৬০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় এক ধরনের সুতা বা কটন। রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সুতা আমদানিতে শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধা আগেই প্রত্যাহার করেছে সরকার। নানা জটিলতা পেরিয়ে গত বুধবার সেটি কার্যকরে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে রাজস্ব বোর্ড। একই সুতা এখন ৪০ শতাংশের বেশি শুল্ক দিয়ে আমদানি করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় রপ্তানিমুখী পোশাক তৈরিতে খরচ বাড়বে। বিশ্ব প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কায় দেশের পোশাকশিল্প মালিকরা।
বিশেষ ধরনের (১০ থেকে ৩০ কাউন্ট) এই সুতা দিয়ে প্রধানত নিট ও ওভেন পোশাক তৈরি হয়। নিট পণ্যের মধ্যে টি-শার্ট, পোলো শার্ট, ট্রাউজার, হুডি, সোয়েটার ও আন্ডারগার্মেন্ট অন্যতম। ওভেন খাতে জিন্স, ডেনিম প্যান্ট, ক্যাজুয়াল শার্ট, গৃহস্থালি টেক্সটাইল এবং তোয়ালে তৈরিতেও ব্যবহৃত হয় এ সুতা।
বাংলাদেশ থেকে বছরে মোট পোশাক রপ্তানি হয় প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা দিয়ে তৈরি পোশাকেই আসে ৬০-৬৫ শতাংশ, যা সাড়ে ৩ হাজার কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা)।
শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার করায় এই পণ্য আমদানিতে বাড়তি খরচ হবে ৭ হাজার কোটি টাকা। আমদানিকারকরা যদি এই সুতা বিদেশ থেকে না এনে দেশীয় টেক্সটাইল মিল থেকে কেনেন, তাহলে এই বিপুল টাকা রাজস্ব হিসেবে পাবে সরকার। তবে শুল্ক দিয়ে পণ্য আনলে বাড়বে পোশাকশিল্পের উৎপাদন খরচ।
প্রজ্ঞাপন জারির পর একই দিন আক্ষেপ করে নিজের ফেসবুক পেজে পোস্ট দেন গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি ও কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান। তিনি লিখেছেন, ‘যদি আপনি একটি শিল্পকে ধ্বংস করতে চান, তবে এটিই হলো তার সঠিক উপায়। একটি অপ্রতিযোগী ব্যাকওয়ার্ড-লিংকেজ শিল্পকে রক্ষা করতে গিয়ে দিনশেষে আপনি একটি প্রতিযোগী ফরোয়ার্ড-লিংকেজ শিল্পকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন। এটা একেবারেই তাজ্জব ব্যাপার (ইনসেইন)।’
‘অপ্রতিযোগী ব্যাকওয়ার্ড-লিংকেজ শিল্প’ বলতে তিনি ফেসবুক পোস্টে কোনো শিল্পের নাম উল্লেখ করেননি। একই সঙ্গে ‘প্রতিযোগী ফরোয়ার্ড-লিংকেজ শিল্প’ কোনটি, সেটিও জানাননি। তবে ‘অপ্রতিযোগী ব্যাকওয়ার্ড-লিংকেজ শিল্প’ মানে টেক্সটাইলস খাত। আর ‘প্রতিযোগী ফরোয়ার্ড-লিংকেজ শিল্প’ মানে গার্মেন্টসশিল্পকেই বোঝায়।
এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এম এ সালাম বলছিলেন, ‘৪০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি গড়া এই শিল্পে এক সার্কুলারেই সব বন্ধ করা সঠিক সিদ্ধান্ত হতেই পারে না। এমন সিদ্ধান্তে সময় বাড়বে, খরচ বাড়বে, ভোগান্তি বাড়বে, নতুন করে ব্যাংকের খরচও যোগ হবে। দুর্নীতিও নতুন করে বাড়বে। সরকার যখন ব্যবসা সহজ করতে চাইছে, উদ্যোক্তারা ব্যবসায় সেট হচ্ছেন। বন্ধ কারখানা চালু করে অর্থনীতি সচলে উদ্যোগ নিচ্ছেন। তখন এমন ঘটনা ব্যবসায় বড় আঘাত।’
খরচ বাড়ায় প্রতি পোশাকের উৎপাদন ব্যয় কত বাড়বে, তা জানাতে পারেননি তৈরি পোশাকশিল্প মালিকরা। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এর পরিমাণ ৩-৫ শতাংশ। তবে এটি নিশ্চিত বিশ্ববাজারে অর্ডারের দরকষাকষির সময় ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার সরবরাহকারীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়ছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী। তা ছাড়া, অর্ডারের শিপমেন্টে বিলম্ব হলে এবং লিড টাইম বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কাস্টমাইজড অর্ডারের জন্য বিকল্প দেশের দিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি তো আছেই।
২০২৫ সালে দেশে বন্ড সুবিধায় আমদানি হয় প্রায় ১২ লাখ টন সুতা। এর মধ্যে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতার আমদানির পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ টন, যার আর্থিক মূল্য ২০ হাজার কোটি টাকা। শুল্ক যোগের পর একই পণ্যের মূল্য হবে ২৭ হাজার কোটি টাকা। এই আমদানি করা সুতার বেশিরভাগ আসে ভারত থেকে। এ ছাড়া চীন, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম থেকেও কিছু সুতা আমদানি হয়।
দেশীয় স্পিনিং মিল বা সুতা প্রস্তুতকারকদের সুরক্ষা দেওয়া এবং সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ করার যুক্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত সেপ্টেম্বর মাসে বন্ড সুবিধা বাতিল করে। আগে শতভাগ কাস্টমস বন্ড সুবিধা থাকায় কোনো শুল্ক বা কর ছাড়াই এই বিপুল সুতা আনতে পারতেন শিল্পমালিকরা। নতুন নিয়মে একই সুতা বাণিজ্যিক আমদানিতে ৩৭ থেকে ৫৮ শতাংশ কর দিতে হচ্ছে। এখন বাণিজ্যিকভাবে সুতা আনতে ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হচ্ছে। লাগছে ব্যাংকে প্রসেসিং ফি। এ অবস্থায় একই পরিমাণ পণ্য এখন আনতে ৭ হাজার কোটি টাকা বাড়তি লাগছে। এই বিপুল টাকা সরকার শুল্ক হিসেবে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অহিদ নিহাদ এন্টারপ্রাইজের মালিক আহাদ চৌধুরী বললেন, জটিলতার কারণে এখন বিপুল পরিমাণ সুতার চালান চট্টগ্রাম বন্দরে আটকা পড়েছে। রাজস্ব বোর্ড অবশ্য ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে আগের মতো বন্ডের শুল্ক সুবিধা ছাড়াই আটকা পণ্য ছাড়ের সুযোগ দিয়েছে।
এই নীতিকে দেশি খাতের সুরক্ষার কৌশল বলা হলেও বাস্তবে এটি পোশাকশিল্পকে অসম প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন পোশাক খাতের মালিকরা। বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলো ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা উৎপাদনে সক্ষম হলেও মোট পোশাক খাতের মানের বৈচিত্র্য মেটাতে যথেষ্ট নয়।
এম এ সালামের মতে, ‘আমদানি করে আনা সুতার চেয়ে দেশীয় সুতার দাম বেশি। এখন দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতিযোগিতামূলক দরে সুতা বিক্রি নিশ্চিত করুক, আমরা তাদের থেকেই কিনব। আমার উদ্দেশ্য, পোশাক তৈরির উৎপাদন খরচ কমিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা।’
স্থানীয় মিলগুলো প্রতিযোগিতা ছাড়া একচ্ছত্র বাজার সুবিধা পেলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে এবং সুতার দাম ইচ্ছামতো বাড়ানোর সুযোগ পায়। ফলে এক খাতকে রক্ষা করতে গিয়ে দেশের রপ্তানি আয়ের চালিকাশক্তি পোশাক খাতকে বিশ্ববাজারে দুর্বল করে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
অর্থনৈতিক এই সিদ্ধান্তের পেছনে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রভাবকেও উড়িয়ে দিচ্ছেন না এ খাতের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা। ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতার প্রধান উৎস ছিল প্রতিবেশী ভারত। নতুন এই আমদানি নিষেধ ও নীতিগত পরিবর্তনের ফলে ভারতীয় সুতা রপ্তানিকারকরা বাংলাদেশে বড় আকারের বাজার হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে এর সুযোগ নিয়ে চীনের তৈরি কাপড় বা উচ্চ মানসম্পন্ন বিকল্প টেক্সটাইল কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।



