‘মিনি বাংলাদেশ’ এখন জঙ্গল

ছবি: আগামীর সময়
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৭১ মিটার উঁচু টাওয়ার। একটু এগোলেই চোখে পড়ে জাতীয় সংসদ ভবনের ক্ষুদ্র আদল। তার পাশে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। আরও ভেতরে আহসান মঞ্জিল, কার্জন হল, লালবাগ কেল্লাসহ দেশের নানা ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রতিরূপ। কিন্তু কাছে গেলেই চোখে পড়ে অন্য রূপ। কোথাও ভেঙে ফেলা হয়েছে লোহার সীমানাপ্রাচীর। বন্ধ ফটকে ঝুলছে তালা। জীর্ণ টিকিট কাউন্টার। হাঁটার পথের ওপর ঝোপঝাড়। কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও ফাটল। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে কাচের টুকরো। ঐতিহাসিক স্থাপনার রেপ্লিকাতে পড়েছে সবুজ শেওলার আস্তরণ।
চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের পাশে ‘মিনি বাংলাদেশ’। এই পার্কের এমন করুণ হাল দুই বছর ধরে। এতদিন স্বাধীনতা পার্ক নামে পরিচিত ছিল। গত মাস থেকে তার পুরোনো নাম ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’। একসময়ের নান্দনিক সৌন্দর্যের এই বিনোদনের জায়গাটিতে এখন রীতিমতো মাদকাসক্তদের আড্ডা বসে। বিদ্যুৎ নেই। পানি জমতে জমতে মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো পার্ক।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সপ্তাহখানেক আগে এই কমপ্লেক্সে প্রতীকী পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করেছেন। তাতে পার্কের পরিবর্তন আসেনি। তবে জেলা প্রশাসক কিছুদিনের মধ্যে পার্কটি চালুর বিষয়ে আশাবাদী।
তিনি আগামীর সময়কে জানালেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের এই পার্ক আগামী দেড় মাসের মধ্যে চালুর বিষয়ে আমার সঙ্গে মন্ত্রী ও সচিবের কথা হয়েছে। নতুন একজন ইজারাদার খোঁজা হচ্ছে। যিনি সবগুলো স্থাপনা মেরামত করবেন এবং এটা পরিচালনা করবেন। ইজারাদার পেলেই পার্ক নতুন করে পুরোনো রূপে ফিরে যাবে। জেলা প্রশাসন এর তত্ত্বাবধান করবে।’
প্রায় ১৬ একর জায়গাজুড়ে ২০০৬ সালে গড়ে তোলা হয়েছিল এই কমপ্লেক্স। প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি প্রকল্পটির ভাবনাটা ছিল ব্যতিক্রমী। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যকে ক্ষুদ্র পরিসরে এক জায়গায় তুলে ধরা।
২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেন। প্রতিষ্ঠার সময় কমপ্লেক্সটির নাম ছিল ‘জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স’। তবে নাম যাই হোক মানুষের কাছে পার্কটি ‘মিনি বাংলাদেশ’ হিসেবেই পরিচিত। পুরোনো নামে ফেরত গেলেও কমপ্লেক্সের আগের প্রাণচাঞ্চল্য ফেরেনি। বর্তমানে এর ভেতরের চিত্র যেন পুরোনো দিনের সেই ব্যস্ততার সঙ্গে একেবারেই মেলে না।
মলিন ইতিহাস-ঐতিহ্য
ইতিহাস ঐতিহ্যের ভাঙাচোরা স্থাপনাগুলো একবার ঘুরে আসা যাক। আহসান মঞ্জিলের প্রতিরূপটির চারপাশে আগাছা। দেয়ালের পলেস্তারা উঠে গেছে। কার্জন হলের বাইরের অংশে ফাটল ও শেওলার আস্তরণ। জাতীয় সংসদ ভবনের ক্ষুদ্র সংস্করণও পড়ে আছে অযত্নে। জাতীয় স্মৃতিসৌধের চারপাশে বেড়ে উঠেছে ঘাস ও ঝোপঝাড়। লালবাগ কেল্লা, হাইকোর্ট, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার শুধু ভাঙেনি বিভিন্ন স্পটে জন্মেছে আগাছা।
একই দশা দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, বড় কুঠি, ছোট কুঠি ও সেন্ট নিকোলাস চার্চের প্রতিরূপের রেপ্লিকাগুলোও। এ কারণেই এটাকে বাংলাদেশের একটি ছোট সংস্করণ বা মিনি বাংলাদেশ বলা হয়ে থাকে।
একসময় এসব স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ ছবি তুলতেন। এখন অনেক জায়গায় স্থাপনাগুলোর কাছে পৌঁছানোই কঠিন। টয়ট্রেনের পুরোনো রেলপথের অনেক অংশ আর নেই। কৃত্রিম জলাধারে পানিতেও শেওলার পুরু স্তর। ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেছে হাঁটার পথ। রোলার কোস্টার, ফেরি হুইল, মেরি-গো-রাউন্ড ও বাম্পার কারে মরিচা ধরেছে। কোনো কোনো রাইডের যন্ত্রাংশ নেই। অযত্নে পড়ে আছে সবকিছু। যেখানে একসময় শিশুদের হাসির শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন কবরের নীরবতা।
কমপ্লেক্সের অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রায় ৭১ মিটার বা ২৪ তলা উচ্চতার টাওয়ার। ওপরের ঘূর্ণায়মান রেস্টুরেন্ট। এটার চূড়া থেকে দেখা যেত চট্টগ্রাম শহর, বন্দর, কর্ণফুলী নদী ও আশপাশের এলাকা। আজ সেই টাওয়ারও বিবর্ণ ও বিকল। লিফট নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে কাচের ভাঙা টুকরো।
নিরাপত্তা নেই, বেতনও বাকি
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কমপ্লেক্সে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এরপর পরিচালনাকারীরা সরে গেলে বন্ধ হয়ে যায় বিনোদন পার্ক। একসময় ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত এই বিনোদনকেন্দ্র আর নিয়মিতভাবে খোলেনি। বন্ধ হয়ে যায় এর রক্ষণাবেক্ষণও।
নিরাপত্তাকর্মী জোবায়ের উল্লাহ বললেন, 'আমাদের নয় মাসের বেতন বাকি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বললে দুই-তিন হাজার টাকা ধরিয়ে দেন। সীমানাপ্রাচীরও অনেক জায়গায় নেই। দিনে যেমন, রাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ। আমরাও ভয়ের মধ্যে থাকি।'
এ এলাকা দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করেন মোহাম্মদ আজিম। তিনি জানালেন, 'এটি আগে জনপ্রিয় একটি বিনোদনকেন্দ্র ছিল। তখন বাচ্চাদের নিয়ে প্রায় আসতাম। এখন সেটি পুরো জঙ্গল হয়ে গেছে।'



