জিনিসপত্রের দাম চড়া, ছুটির দিনে ক্রেতা কম

ছবি: আগামীর সময়
শুক্রবার সকালের নরম রোদ চড়ে বসার আগেই চট্টগ্রামের কাঁচাবাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে গমগম করার কথা। ছুটির দিন মানেই পরিবারের জন্য একটু ভালো-মন্দ রান্নার তাগিদ, আর ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফেরা। তবে চট্টগ্রামের কাজিরদেউড়ি বাজার, রিয়াজউদ্দিন বাজার কিংবা চকবাজারের মতো জনবহুল মোকামগুলোতে সেই চেনা আনন্দ চোখে পড়ে না।
বাজারে পা ফেলতেই মধ্যবিত্তের চোখে-মুখে খেলা করে চাপা আতঙ্ক। সবজি, মাছ কিংবা মাংস প্রতিটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দাম শুনে ক্রেতাদের কপালে যেন চিন্তার রেখা গাঢ় হচ্ছে। সবজি থেকে শুরু করে মাছ-মাংস সবকিছুর জন্য গুনতে হচ্ছে বাড়তি দাম।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবজির বাজারে যেন আগুন লেগেছে। গ্রীষ্মকালীন সবজির দাম কমার কোনো নাম নেই, এমনকি শীতের আগাম সবজিও বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ঝিঙা, শসা, বরবটি ও ঢ্যাঁড়শ কেজিতে ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে মিলছে না। কাঁকরোল ছুঁয়েছে ১২০ টাকা। সরবরাহ সংকট আর পরিবহন খরচের কারণ দেখিয়ে কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে টমেটো ২০০ টাকা।
শীতের সবজি ফুলকপি ১৫০ টাকা এবং শিম বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। সাধারণ ক্রেতারা আলু, লাউ বা পেঁপের মতো কয়েকটি সহনীয় পদ কিনে কোনোমতে দিনের রান্না সাড়ার চেষ্টা করছেন। লেবুর এক জোড়া কিনতে গেলেও গুনতে হচ্ছে ৪০ টাকা।
সবজির এই উত্তাপের মাঝে ডিমের দাম ডজনে ১০ টাকা কমে লাল ডিম ১৪০ ও সাদা ডিম ১৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। স্বস্তি মিলছে না আমিষের বাজারে। মুরগির বাজারে ব্রয়লার ১৮০ টাকা, সোনালি ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা এবং দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৬৩০ থেকে ৬৪০ টাকায়। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র গরুর মাংসের দোকানে। যে দোকানে আগে ক্রেতাদের লাইন লেগে থাকত, সেখানে ক্রেতার আকাল। এক কেজি গরুর মাংস হাড়সহ ৭৫০ থেকে ৮৫০ এবং শুধু মাংস বিক্রি হচ্ছে ১,০০০ টাকায়; খাসির মাংসের দাম দাঁড়িয়েছে ১,২৫০ টাকায়।
ফইল্যালতলী বাজারের মাংস ব্যবসায়ী রফিক মিয়ার দীর্ঘশ্বাস থেকেই বাজারের করুণ দশা স্পষ্ট বোঝা যায়। একসময় শুক্রবারে দুই থেকে তিন মণের একটি আস্ত গরু একাই জবাই করে বিক্রি করতেন তিনি। এখন আরেকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে সেই আকারের একটি গরু তুলছেন, তবু দিনের শেষে মাংস অবিক্রীত থেকে যাওয়ার ভয় তাড়া করে। এক কেজি মাংসের দাম মধ্যবিত্তের সারা দিনের বাজেটের সমান হয়ে যাওয়ায় অনেকেই মাসে একবার এক কেজি মাংসের বেশি কিনতে পারছেন না। ফলে সাধারণ পরিবারের পাত থেকে আমিষ প্রায় উধাও হওয়ার পথে।
এদিকে সাগরে ২১ দিনের নিষেধাজ্ঞার অজুহাতে সামুদ্রিক মাছের দাম কেজিতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে। ফলে সবজি থেকে মাছ-মাংস প্রায় সব পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছে পারিবারিক বাজেট।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছাতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে দাম বাড়ে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বর্তমানে কোনো সংকট নেই। কিন্তু জিনিসের দাম বাড়তি। বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণের নিয়ম মানা হচ্ছে না। বড় পাইকার ও আড়তদারদের কারসাজির কারণে দাম বাড়লেও প্রশাসনের অভিযান মূলত খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। সঠিক ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেউই।
চড়া দামের চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই মাছ, মাংস ও ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবার কম কিনছেন। ফলে বাজারের এই চাপ শুধু পারিবারিক ব্যয় বাড়াচ্ছে না, মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির ওপরও প্রভাব ফেলছে।
বিক্রেতারা দাবি করছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত গাড়িভাড়া ও হাতবদলের খরচ অনেক বেড়ে গেছে, যার দায় পড়ছে সাধারণ ক্রেতার ওপর। অন্যদিকে ক্রেতাদের স্পষ্ট অভিযোগ, অজুহাত আর সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বাজার এখন নাগালের বাইরে। ছুটির দিনের সকালের দীর্ঘশ্বাস কমাতে এবং অস্থিতিশীল বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর ও সরাসরি বাজার তদারকি ছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখছেন না অসহায় সাধারণ মানুষ।




