অর্থনীতির নতুন মধু কাটিমন আম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ক্যালেন্ডারে চলছে হেমন্তকাল, অর্থাৎ ভোরে শীতের আগাম বার্তা। এ সময়ে আমগাছের পাতা ঝরে নতুন কুঁড়ি আসার প্রস্তুতি শুরু। এরকম অসময়ে বাজারে মিলছে পাকা আম। তাও আবার দেশি। ফলের দোকানে বিদেশি আপেল, কমলা, আঙুর, মাল্টাকে ঠেলে জায়গা করে নিয়েছে এ দেশের মাটি-আলো-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা বিশেষ এক আম। নাম তার ‘কাটিমন’। উজ্জ্বল সোনালি হলুদ নজরকাড়া রঙের এই আম বিদেশি ফলের স্বাদ-মান-দামে টেক্কা দিচ্ছে।
শুধু
কি
তাই
,
বিপুল
ক্রেতাও
টানছে।
অমৌসুমি
এই
আম
বাজিমাত
করে
দেশের
ফল
-
অর্থনীতিকেই
চমকে
দিয়ে
নতুন
সম্ভাবনার
কথা
জানান
দিচ্ছে।
বাংলাদেশে আমের মূল মৌসুম মে থেকে জুলাই। আগস্টের এক মাস মেলে শেষ মৌসুমের ‘আশ্বিনী’, ‘বারি-১১’ ও ‘গৌড়মতী’ আম। তিনটিই দেশি জাত। এরপর বাজারে আর আম পাওয়া যায় না। গেলেও ভিনদেশি। উড়োজাহাজে আসে আফ্রিকা-থাইল্যান্ড-মিসর থেকে। কিন্তু সেগুলোর দাম থাকে চড়া। মেলে শুধু সুপার শপেই। কেজি এক থেকে দেড় হাজার টাকা। সেই স্থানে বিদেশি আমকে সরিয়ে আসন গেড়েছে দেশি কাটিমন। ক্রেতারা এখন খাচ্ছেন কেজি ৩৫০-৪০০ টাকায়।
আমের মূল মৌসুমের পর দেশের বাজারের আড়ত, খুচরা দোকানে আমদানি করা ফলের থাকে দাপট। অমৌসুমে খুচরা দোকানে সাজানো বিদেশি ফলের সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছে এই আম। এখন খুচরা ফলের দোকানে বিদেশি আপেল বিক্রি হচ্ছে কেজি ৩৮০, মাল্টা ৪৮০, কমলা ৫২০ ও আঙুর ৪৫০ টাকা। সেই তুলনায় কাটিমন মিলছে অর্ধেক দামে। তরতাজা দেশি আম বলে ক্রেতাদের অনেকেই বিদেশি ফলের বদলে বেছে নিচ্ছেন এই আমকেই।
এর প্রমাণ মেলে ফল আমদানিকারক আল মদিনা ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিংয়ের মালিক নাজিম উদ্দিনের কথায়। তিনি আগে এ সময়ে বিদেশ থেকে আম আমদানি করতেন। এখন আমদানি বন্ধ করেছেন। কারণ হিসেবে বললেন, ‘কাটিমন আসার পর তিন বছর আগেই আম আমদানি বন্ধ করে দিয়েছি। মিসর থেকে ফ্লাইটে এই আম আনতাম। এখন আনলে পাইকারিতেই কেজি ৭০০-৮০০ টাকা দরে বিক্রি করতে হবে। খুচরা বাজারে এত দামে আমের ক্রেতা নেই। কাটিমন বিদেশি আমের চেয়ে দামে-স্বাদে অনেক এগিয়ে। ঢাকা-চট্টগ্রামের বেশ কিছু সুপার শপে অবশ্য বিদেশি আম বিক্রি হয়।’
চট্টগ্রামের ফলমন্ডির আড়তদার নাসির উদ্দিন বলছিলেন, ‘এবার দাপটের সঙ্গে কাটিমন বিক্রি হয়েছে। এত তরতাজা আম বোঁটা-পাতাসহ এমনভাবে আড়তে আসে, মনে হয় এখনই গাছ থেকে পাড়া। বিদেশি আম যেমন তাপমাত্রা ঠিক রাখার ঝামেলা থাকে, কাটিমনে সে সমস্যা নেই। ফলে খুচরা দোকানির নজর কাড়ে অনায়াসেই। এই আমকে যদি আরও কয়েক মাস রাখা যেতে, তাহলে বছর জুড়ে আমের স্বাদ পেতেন দেশের মানুষ।’
২০২৩ সাল থেকে কাটিমন আম বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসে। তখন থেকেই ক্রেতার নজর কাড়ে। ২০২৫ সালে অক্টোবর পর্যন্ত এই কাটিমন আম বাজারে পেয়েছিলেন ক্রেতা। ২০২৬ সালে নভেম্বর পেরিয়ে ডিসেম্বরের শুরুতেও মিলবে এ ফলটি। অর্থাৎ প্রতি বছর মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মিলছে এই দেশি আম। বাকি চার মাস বিশেষ কৌশলে কাটিমন উৎপাদন করে বাজারে রাখার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। চলছে অমৌসুমে বিকল্প বা নতুন আম আনার গবেষণাও। আশা করা হচ্ছে, আগামী তিন বছরের মধ্যেই সারা বছর খেতে পারবেন বাংলাদেশের আমপ্রেমীরা।
দেশে কাটিমনের সফলতার পেছনে প্রথমেই আসে কৃষিবিজ্ঞানী ড. মেহেদী মাসুদের নাম। এই বিজ্ঞানী বলছিলেন, ‘২০১৪ সালে আমরা যখন প্রথম থাইল্যান্ড থেকে কাটিমনের চারা এনে হর্টিকালচার সেন্টারে পরীক্ষা শুরু করি, তখন অনেকেই ভাবেননি এটি এত দ্রুত বাজার দখল করবে। পুরনো ও কম লাভজনক আমগাছে গ্রাফটিং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের পর এটি এখন চাষিদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে বেশ লাভজনক। স্বাদ-মান-সৌন্দর্য— সবদিক থেকেই এটি আসলেই অনন্য। এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এটিকে কীভাবে সারা বছর উৎপাদনে আনা যায়।’
কাটিমন মূলত থাইল্যান্ডের বারোমাসি জাতের আম। থাইল্যান্ডে ‘কাতেমন’ নামেই পরিচিত। বাংলাদেশে নাম পাল্টে ‘কাটিমন’। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের আওতায় ড. মেহেদী মাসুদ প্রথম দুই হাজার চারা আমদানি করেন। মাতৃগাছ তৈরি করে ২০১৬ সালে ৬৪ জেলার হর্টিকালচার সেন্টারে চারা বিতরণ করে পরীক্ষা চালান। প্রায় একই সময়ে খাগড়াছড়িতে এক উদ্যোক্তা নিজেই চাষ শুরু করে দেন। সফলতার গল্প শুনে দ্রুত ফলন ও মিষ্টি স্বাদের কথা জেনে যান বাণিজ্যিক চাষিরাও। কয়েক বছরের মধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মেহেরপুরের মাঠে কাটিমনের সারি সারি বাণিজ্যিক বাগান গড়ে ওঠে।
কাটিমনের মূল শক্তি হলো, এর চমৎকার স্বাদ এবং বছর জুড়ে ফলন দেওয়ার ক্ষমতা। অত্যন্ত মিষ্টি, রসালো ও আঁশহীন। এর টিএসএস বা মিষ্টতার পরিমাণ ২২ শতাংশ, যা অত্যন্ত উচ্চমানের। আঁটি পাতলা হওয়ায় আমের ৭৮ শতাংশই খাওয়ার উপযোগী। এর সবচেয়ে বড় গুণ, একই গাছে মুকুল-কাঁচা-পাকা আম ঝুলতে থাকে। দেখে মনের শান্তি চোখের সুখ।
অন্যদিকে বারি-১১ জাতের আমের নিচের অংশ কিছুটা টক, ফলন অনিয়মিত এবং বাণিজ্যিক স্থায়িত্ব কম, রোগবালাই বেশি। অফসিজনের আরেক জাত ‘ব্যানানা ম্যাংগো’ মূলত মূল মৌসুমের শেষ দিকের, যা নিয়মিত অফসিজনে ফলন দিতে পারে না। তাই স্বাদে ও বাণিজ্যিক স্থায়িত্বে কাটিমনের কাছে অন্য জাতগুলো টিকতে পারছে না।
এমন প্রেক্ষাপটে অফসিজনে আরও বেশি সময় কীভাবে কাটিমন উৎপাদন করে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, সে পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ শরাফ উদ্দিন। ফ্লাশিং, প্রুনিং (ডাল ছাঁটাই) ক্যালেন্ডার এবং শীতকালীন ফলন ধরে রাখার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা শেষদিকে বলে জানালেন তিনি। এটি সফল হলে অক্টোবর-নভেম্বরের সীমা পেরিয়ে কনকনে শীতের দিনগুলোয়ও (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) বাজারে নিয়মিত তাজা কাটিমন সরবরাহ করা সম্ভব হবে মনে করছেন।
কাটিমনের বাজার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় সাড়ে পঁাচ হাজার একর জমিতে চাষ হয়েছিল। মোট উৎপাদন ছিল ৮০ হাজার টন। ১৮০ টাকা গড় পাইকারি দরে বাজার ছিল ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার। ২০২৬ সালে আবাদ বেড়ে হয়েছে সাত হাজার একর। উৎপাদন উন্নীত এক লাখ টনে। পাইকারি দর প্রতি কেজি ২০০ টাকা হিসাবে ২০২৬ সালে কাটিমনের আর্থিক বাজার ২ হাজার কোটি টাকার। এক বছরে উৎপাদন ২৫ এবং বাজারমূল্য প্রায় ৩৮ শতাংশ বেড়েছে। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় নতুন নতুন উদ্যোক্তারা কাটিমন চাষে ঝুঁকছেন।
কাটিমন চাষে কৃষকদের আগ্রহের আরেকটি কারণ, বেশি মুনাফা। জুন-জুলাইয়ের মূল মৌসুমে ভালো জাতের আম কেজিতে ৫০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়। সে সময়ে কাটিমন বিক্রি হয় একই দামে। আর অমৌসুমে এখন কাটিমন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২২০ টাকায়। তিন গুণ লাভের কারণে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে চাষও।
দেশে কাটিমন আম চাষে বর্তমানে শীর্ষে পাঁচটি এলাকা। রাজশাহীর গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, মেহেরপুর সদর, চুয়াডাঙ্গা এবং পার্বত্য জেলা বান্দরবান। বিশেষ করে বরেন্দ্র এবং পাহাড়ি অঞ্চলের জলবায়ু ও মাটি কাটিমন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী— সেটি প্রমাণিত।
চলতি ২০২৬ সালে দেশে বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ হয়েছে পাঁচ লাখ চার হাজার একর জমিতে। মোট উৎপাদন ২৭ লাখ টনের বেশি বলে ধারণা কৃষি দপ্তর ও ব্যবসায়ীদের। আর দেশীয় এই আমের বাজার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার। এই টাকার অঙ্ক আমের উৎপাদন, বিপণন, মোড়কীকরণ ও পরিবহন— সব মিলিয়ে ধরা হয়েছে।
এর মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা কাটিমনের বাজার। অমৌসুমের বাকি চার মাসে কাটিমন বা অন্য জাতের আম দেশে উৎপাদন করে বাজারে আনা গেলে এই বাজার দ্বিগুণ হয়ে যাবে। আর অমৌসুমে যত বেশি দেশি আম বাজার দখল করবে, ততই আমদানি কমবে। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। দেশীয় কৃষকরা স্বাবলম্বী হবেন। বছর জুড়ে আমে স্বনির্ভর হবে বাংলাদেশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাবে, বছর গড়ে ছয় লাখ টন বিদেশি ফল আমদানি হয়। এই ফলের আমদানিমূল্য ১২ হাজার কোটি টাকা। আর বাজারমূল্য ১৬ হাজার কোটি। কাটিমন যদি বছর জুড়ে ফলন নিশ্চিত করে বাজারে সরবরাহ করা যায়, তাহলে আমদানি কমবে।
শৌখিন কৃষক ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল ইসলাম জানালেন, অফসিজনে তাজা দেশি ফলের ঘাটতি থাকার কারণেই ক্রেতারা বাধ্য হয়ে চড়া দামে বিদেশি আপেল, কমলা বা আঙুর কেনেন। কাটিমন পুরো অফসিজনে ২৫০ টাকা কেজিতে পাওয়া গেলে আপেল-কমলার ওপর ক্রেতাদের নির্ভরতা অন্তত ২০-২৫ শতাংশ কমবে। এতে যে বিপুল টাকা সাশ্রয় হবে, তা দেশের কৃষি অর্থনীতির মধ্যেই থাকবে।