বন্ধ জলকদরের কপাট
খাল আছে, গেট আছে—তবুও নামছে না পানি
- ২৪৬ স্লুইসগেটের ১৫৭টিই অবৈধ, জলাবদ্ধ চার লাখ মানুষ
- বৈধ গেটের ৩৭ শতাংশও অকার্যকর, রক্ষণাবেক্ষণহীন বছরের পর বছর
- মাছ রক্ষায় বন্ধ রাখা গেট খুলল পাউবো, মিলল প্রভাবশালীদের দখলের প্রমাণ
- উপজেলার ৩৫.৭ শতাংশ এলাকা এখন পানির নিচে, ডুবেছে ১৫ হাজার ২১২ হেক্টর জমি

ছবি: আগামীর সময়
মোট ২১২ গ্রাম নিয়ে চট্টগ্রামের বাঁশখালী। এসব গ্রামের পানি বের হওয়ার একমাত্র পথ ‘জলকদর খাল’। ৩২ কিলোমিটার এ খাল বয়ে গেছে বাঁশখালীর মাঝ বরাবর। জলকদর ও এর সঙ্গে সংযুক্ত খালে আছে ২৪৬ স্লুইসগেট। এরমধ্যে বৈধ মাত্র ৮৯টি। বাকিগুলো স্থানীয় প্রভাবশালীরা আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো নির্মাণ করেছে। অবৈধভাবে নির্মিত এসব স্লুইসগেটের উপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এই ১৫৭ স্লুইসগেট এখন বাঁশখালীর মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মাণ করা বৈধ স্লুইসগেটগুলোর একাংশ অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। প্রভাবশালীরা বন্ধ রেখেছে তাদেরগুলো। পানি যাওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে বাঁশখালীর ৪ লাখ মানুষ এখন বন্যার সঙ্গে লড়ছে।
বানের পানিতে ভেঙে গেছে ঘরবাড়ি, ভেসে গেছে মাছের খামার, গৃহপালিত পশু ও হাঁস-মুরগি। গৃহহীন হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। মারা গেছে শিশুসহ ৪ জন।
বাঁশখালীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ আছে ১৪০ কিলোমিটার। এই বাঁধের স্লুইসগেটের ৬৪ শতাংশই অবৈধ। বৈধ স্লুইচগেটের ৩৭ শতাংশ বা ৩৩টি অকার্যকর। যেগুলো এখনো সচল বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোরও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই গেটসংলগ্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
কৃত্রিম উপগ্রহের চিত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাঁশখালী উপজেলার মোট আয়তনের প্রায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ এলাকা এখন পুরোপুরি পানির নিচে। এতে উপজেলার অন্তত ১৫ হাজার ২১২ হেক্টর জমি জলমগ্ন হয়ে পড়েছে, যার একটি বড় অংশই ফসলিজমি ও বসতবাড়ি।
আইন অনুযায়ী, স্লুইসগেট রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয়ভাবে পানি ব্যবস্থাপনা সংগঠন গঠনের কথা থাকলেও তা করেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমের আগে স্লুইসগেট মেরামত করার কথা থাকলেও তা-ও পালন করেনি সংস্থাটি।
বিধিমালা অনুযায়ী গেট রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকার কথা থাকলেও তা নেই। আর পানি উন্নয়ন বোর্ডও দীর্ঘদিন এটি মেরামত করেনি
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ বলেছেন, ‘রেকর্ড বৃষ্টির কারণে স্লুইসগেটের সক্ষমতার চেয়ে বেশি পানি জমে গেছে। যার কারণে পানি নামতে সময় নিচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে দ্রুত সময়ে পানি নিষ্কাশন হয়, সেজন্য স্লুইসগেট আরও বাড়ানো হবে।’
মাটিচাপা নতুন গেট, রক্ষণাবেক্ষণহীন পুরনোটি
বাঁশখালীর গুনাগরী থেকে বয়ে গেছে কোদালা খাল। খালটি গিয়ে যুক্ত হয়েছে জলকদর খালে। কোকদণ্ডী, গুনাগরী, চাপাছড়ি ও ইলশা-এই চার গ্রামের পানি এ খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু শনিবার বিকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খাল দুটি যেখানে সংযুক্ত হয়েছে, সেখানকার দুটি স্লুইসগেট দিয়ে পানি বের হচ্ছে সামান্যই।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. বাহাদুরসহ পাঁচজন জানান, নতুন যে স্লুইসগেটটি নির্মাণ করা হয়েছে তার ওপরের অংশে মাটি জমে আছে, যার কারণে পানি পর্যাপ্ত বের হতে পারছে না। অর্থাৎ গেট নির্মিত হলেও মূলস্রোতের সঙ্গে এর কার্যকর সংযোগই তৈরি হয়নি। পাশের পুরনো গেটটিও দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনজীবী জাহেদুল ইসলাম বলেছেন, বিধিমালা অনুযায়ী গেট রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকার কথা থাকলেও তা নেই। আর পানি উন্নয়ন বোর্ডও দীর্ঘদিন এটি মেরামত করেনি।
বাহারছড়া ও খানখানাবাদকে দুই ভাগ করে বয়ে যাওয়া আছিয়া খাল বঙ্গোপসাগরের বেড়িবাঁধ থেকে শুরু হয়ে গিয়ে মিশেছে জলকদর খালে। এই খালের মুখেও স্লুইসগেট আছে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহজাহান বললেন, গেটটি কখনো মেরামত হতে দেখেননি তিনি।
বাহারছড়া ইউনিয়নের সাবেক সদস্য কামরুল আলম জানালেন, ‘স্লুইসগেটগুলো অকার্যকর থাকায় প্রায় ছয় দিন ধরে পানিতে ডুবে কষ্ট পাচ্ছে বাঁশখালীর মানুষ। এগুলো সচল করতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।’
মাছ-লবণ চাষের জন্য অবৈধ গেট, নিয়ন্ত্রণ প্রভাবশালীদের হাতে
ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের তথ্য বলছে, বাঁশখালীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে মোট ২৪৬টি স্লুইসগেট আছে, যার মধ্যে মাত্র ৮৯টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব। লবণ ও মাছ চাষের সুবিধার জন্য বাকি অবৈধ গেটগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। যেগুলোর ওপর পাউবোর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রভাবশালীরাই নিজেদের ইচ্ছামতো এসব গেটের কপাট খোলা-বন্ধ করেন। পাহাড়ি ঢল ও বানের পানি মিলে ভয়াবহ বন্যা তৈরি হলেও এসব জলকপাট খোলেননি তারা।
মাঠপর্যায়ে এর প্রমাণও মিলেছে। গণ্ডামারা, সরল, বৈলছড়ি, পুঁইছড়ি, চাঁপাছড়ি, খানখানাবাদ, সাধনপুর ও ছনুয়া এলাকায় আটটি স্লুইসগেটের কপাট শেষ পর্যন্ত খুলে দেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ গোলাম কাদির বললেন, ‘মানুষ মাছ রক্ষা করতে এসব স্লুইসগেটের মুখে কাঠ দিয়ে আটকে রেখেছিল। আমরা গিয়ে খুলে দিয়েছি। যেখান থেকে খবর পাচ্ছি, সেখানেই ছুটে যাচ্ছি।’
এক ভেন্টের গেট দিয়ে বন্যার পানি সামলানো অসম্ভব
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব ৮৯টি স্লুইসগেটের মধ্যে পুরোপুরি সচল আছে ৫৬টি, আংশিক সচল ১৭টি এবং সম্পূর্ণ অকার্যকর ১৬টি। নিয়ম অনুযায়ী ৫৬টি সচল গেট পরিচালনায় পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই। বছরের পর বছর রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় সচল দাবি করা এসব গেটও পূর্ণ সক্ষমতায় পানি নিষ্কাশন করতে পারছে না।
এ ছাড়া বিদ্যমান গেটগুলোর অধিকাংশইে এক ভেন্টের। সংখ্যায় ৬৭টি, যা দিয়ে সাধারণ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন সম্ভব হলেও বন্যার মতো বিপুল পরিমাণ পানি সামলানো সম্ভব নয়।
আইনে কী আছে
অংশগ্রহণমূলক পানি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৪ ও পানি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা অনুযায়ী, স্লুইসগেট পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের মূল দায়িত্ব স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা সংগঠনের (ডব্লিউএমও)। বিধিমালা অনুযায়ী, কৃষকদের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা কমিটি নিজেরাই গেট খোলা-বন্ধের সময়সূচি ঠিক করে এবং সদস্যদের মধ্য থেকে একজন ‘স্লুইসগেট অপারেটর’ মনোনীত করে। গেটে গ্রিজ লাগানো, ছোটখাটো মেরামত ও পলি অপসারণের মতো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও এই সংগঠনের দায়িত্ব। আর বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় মেরামত সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে বিধিমালায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁশখালী উপবিভাগের প্রকৌশলী অনুপম পাল দাবি করেন, তাদের অধিকাংশ স্লুইসগেট অটোমেটিক হওয়ায় কপাট খোলা-বন্ধের জন্য আলাদা কমিটির প্রয়োজন হয় না। তবে পাঁচ থেকে ছয়টি গেটের জন্য কমিটি রয়েছে।






