চায়নিজ জাহাজে সাংবাদিকের দেড় ঘণ্টা

কর্ণফুলী নদীর তীরে চট্টগ্রাম বন্দরের নোঙর করা বিশাল কনটেইনারবাহী জাহাজের লোহার পাটাতন বেয়ে ওপরে ওঠা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ভুলে পা পিছলে পড়ে গেলে সরাসরি ৩০ ফুট নিচে খরস্রোতা নদীর পানিতে। আহত হয়ে বেঁচেও যেতে পারেন কিংবা পাড়িও জমাতে পারেন পরপারে। খুব সাবধানে পা বাড়িয়ে জাহাজের ডেকে ওঠার পর সম্ভাষণ জানালেন চায়নিজ ক্রুরা। এন্ট্রি বুকে নিজের নাম ও পরিচয় লিখে সরু গলি ধরে এগোতে লাগলাম। সামনে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন জাহাজের চায়নিজ ক্রু।
চীনা বিমানে চড়ে চীনে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল। তাই ভাবছিলাম ফ্লাইটে খাবার পরিবেশনের সময় অন্যরকম এক ঘ্রাণ, যা বাংলাদেশিদের জন্য অস্বস্তিকর। ভাবছিলাম সে অস্বস্তি আবার এই জাহাজেও! না, তেমন কিছু না। সরু ঝকঝকে তকতকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম ছয়তলার ওপর। যেখানে জাহাজের ক্যাপ্টেন বসে ১৮৬ মিটার দীর্ঘ জাহাজটির দিকনির্দেশনা দেন ও চালান। শিপিংয়ের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ব্রিজ’। সিঁড়ি থেকে ব্রিজ পর্যন্ত ওঠার সময় স্নিগ্ধ মিষ্টি গন্ধ দেহ-মনকে সতেজ করে তুলেছে। চীনা জাহাজে এতো পরিবর্তন নিজের মনকে প্রশ্ন করতে লাগলাম। কৌতূহল হলো। পেয়ে গেলাম তার জবাবও।
জাহাজের স্থানীয় এজেন্ট ফ্যামফা সলিউশন লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ আসওয়াদ খান সায়েম বললেন, ‘এই জাহাজগুলো খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। কোনো ধরনের বাজে গন্ধ থাকে না। বাংলাদেশ সমুদ্রসীমায় ঢোকার পর থেকেই খাবার-দাবার থেকে সবকিছুতেই সতর্ক ও সচেতন হয়ে পড়েন নাবিকরা। তারা মুসলিমদের বেশ সমীহ-সম্মান করেন।’
জাহাজের ক্যাপ্টেন জ্যু বলছিলেন, ‘এটি আড়াই বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাং বন্দর থেকে কন্টেইনার নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। ২০ জন ক্রু দিয়ে পরিচালনা করা হয় এই জাহাজ।’
জাহাজটি যে নতুন- বোঝাই যাচ্ছে প্রতিটি পরতে পরতে। সিঁড়ির রঙ, পার্টিশনের ডিজাইন, সুবিশাল ব্রিজের পরিচ্ছন্ন মেঝে, উইন্ডশিল্ড অর্থাৎ ব্রিজ উইন্ডোর সঙ্গে লাগানো টবে রাখা সবুজ-সতেজ গাছ, কন্ট্রোল সিস্টেম অর্থাৎ শিপস হুইল সবকিছুতেই নতুনের আবাহন। ক্রুদের পরিচ্ছ্ন্ন পোশাক, অমায়িক আচরণ, মিষ্টি হাসি সবই মুগ্ধতা ছড়ায়। সংবাদকর্মীদের আপ্যায়ন করতে ব্রিজের ওপর রাখা ইলেকট্রিক কেটলিতে চায়নার বিখ্যাত রঙ চা বানিয়েও খাওয়ালেন। সংবাদকর্মীর কী ধরনের সাপোর্ট লাগবে সে বিষয়ে চায়নিজ নাবিকরা বেশ আন্তরিকতা দেখান। ব্রিজের দুপাশের দুই দরজা খুলে দিয়ে বারান্দা দিয়ে কর্ণফুলী নদী ও বন্দর দেখার সুযোগ করে দিলেন।
সুন্দর ছিমছাম প্রশস্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে কর্ণফুলী নদীর ওপারের দিগন্তবিস্তৃত সবুজ মাঠ। নদীর ঘোলাটে বহমান পানির স্রোত, বৃষ্টির কারণে পানির রঙে ঘোলাটে ভাব। স্রোতের সঙ্গে ছোট্ট টাগবোট ঢেউ তুলে ছুটে চলেছে ১৬ কিলোমিটারের দূরের বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলীর মিলনস্থল অর্থাৎ মোহনায়। ব্রিজ ঘুরে উত্তর পাশে এলেই দেখা যায় বিশাল আকৃতির কি গ্যান্ট্রি ক্রেন। সারি সারি ক্রেনের রঙ যেন হলুদের মিছিল। একদিকে জাহাজ থেকে নামছে পণ্যভর্তি কনটেইনার অন্যদিকে জাহাজে উঠছে রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার। ওঠানামার সময় বিকট শব্দ কানে বাজে। স্বয়ংক্রিয় হ্যান্ডলিংয়ে বিপত্তি দেখা দিলেই মাইক্রোফোনেই নির্দেশনা দিতে থাকে। অর্থাৎ কোনো কিছু থেমে নেই, থামতে দেওয়া হয় না। বন্দরের ইয়ার্ডে নানা রঙের হাজার হাজার কনটেইনারের স্তূপ। কোটি টাকার পণ্যের বাক্স নয়, যেন রঙের এক উৎসব।
কাজ শেষে জাহাজের ক্যাপ্টেন চায়নিজ নাগরিক ক্যাপ্টেন জ্যু আমন্ত্রণ জানালেন নিজের অফিস কাম রেসিডেন্সে। জাহাজের ওপরের তলায় ব্রিজ। যেখান থেকে জাহাজ পরিচালনা করা হয়। ব্রিজের নিচে ক্যাপ্টেন ফ্লোর। বিশাল ফ্লোরের একপাশে টেবিল-চেয়ার। তার পাশে পার্টিশনে টানানো সারি সারি তাক। সেই তাকে অসংখ্য ফাইল। টেবিলে রাখা কম্পিউটার। এখান থেকে বসেই তিনি দেখতে পান পুরো জাহাজের চারপাশ ও গতিবিধি। পাশে আরেকটি ডাইনিং টেবিল। তাতে সাজানো কোমলপানীয়, খাবার পানি, বিস্কুট, কেকসহ হালকা খাবার। ক্যাপ্টেন জ্যু সেসব তুলে দিচ্ছেন আমাদের হাতে। খাওয়ার পর সঙ্গে নেওয়ার জন্য আবার ফ্রিজ থেকে এনে দিলেন আরেক দফায় বিভিন্ন খাবার। সবই ছিল চায়নার তৈরি।
কেউ একজন অবাক হয়ে পাশ থেকে বলে উঠলেন, ‘এত সুন্দর ক্যাপ্টেনের অফিস ও থাকার ঘর! আমারও ক্যাপ্টেন হতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বয়স তো আর নেই।’
পাশে থাকা চট্টগ্রাম বন্দরের পাইলট ক্যাপ্টেন আসিফ আহমেদ বললেন, ‘এত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রাখবে যে, এই মোহ থেকে সহজে বের হওয়া যায় না।
জাহাজটির নাম ‘এসআইটিসি হুমিং’। ২৬৯৮ কন্টেইনার ধারণক্ষমতার এই জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয়েছে ১৫৫১ এবং নিয়ে যাওয়া হবে ১৫০০ কনটেইনার।
শেষ বিদায়। ডেকে নেমে আসলাম। ক্যাপ্টেন জ্যু হাত চেপে ধরে বললেন, ‘বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আমি অসংখ্যবার এসেছি এই বন্দরে। এখানকার মানুষ খুব ভালো।’





