সম্ভাব্য প্রার্থীদের ‘আমলনামা’ লিখছেন গোয়েন্দারা

সংগৃহীত ছবি
সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি। কবে নাগাদ হবে, তারও কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এরপরও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আলাপ-আলোচনা ডানা মেলতে শুরু করেছে। মেয়র ও কাউন্সিলর পদে লড়াইয়ের জন্য অনেকেই গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে মাঠ গরম করার চেষ্টায় আছেন। রঙ-বেরঙের পোস্টারও শোভা পাচ্ছে দেয়ালে।
ব্যালটের লড়াই মাঠে গড়ানোর আগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সামনে আরেক ‘পরীক্ষা’। তাদের রাজনৈতিক অতীত-বর্তমান, ভালো-খারাপ কাজ ও অপরাধ-নিরপরাধের খতিয়ান পরখ করতে মাঠে নেমেছেন গোয়েন্দারা। এলাকায় কার জনপ্রিয়তা কেমন, কার বিরুদ্ধে কত মামলা, দলের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা কেমন, কার পাল্লা ওজনে ভারী— এসব খুঁটিনাটি জানতে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বিশেষ শাখার (সিটিএসবি) কর্মকর্তারা যাচ্ছেন পাড়ায়-এলাকায়।
যদিও সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী তার অধীন গোয়েন্দাদের এসব কার্যক্রমের বিষয় এড়িয়ে গেলেন। বললেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে জরিপ করলে করতে পারে। পুলিশের কার্যক্রমের বিষয়টি আমার জানা নেই।’
গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ২১ নম্বর জামালখান ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী সাহেদ বকস্ বললেন, ‘আমার কাছে তথ্য নেওয়ার জন্য এসেছিল। আমি দিইনি। আমাকেই জিজ্ঞেস করছে এলাকায় আমার জনসমর্থন কেমন। আমি হাসলাম। কোনো প্রার্থী কি বলবে যে তার জনসমর্থন খারাপ? আমি বললাম, আমার গোয়েন্দা রিপোর্টের দরকার নেই। আমার দরকার জনগণের ভোট।’
চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব আরিফ মঈনুদ্দিন মত দিলেন এভাবে গোয়েন্দা দিয়ে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে। তিনি বললেন, ‘এমন খবরও পাচ্ছি, গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে নাকি সরকারি দল তাদের প্রার্থী ঠিক করবে। গোয়েন্দা সংস্থানির্ভর রাজনীতি আমরা প্রত্যাখ্যান করি। প্রার্থীর জনপ্রিয়তা নির্ধারণ করবে জনগণ। রাজনীতির কাজে গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে তাদের পেশাদারিত্ব নষ্ট করা হচ্ছে।’
এমন খবরও পাচ্ছি, গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে নাকি সরকারি দল তাদের প্রার্থী ঠিক করবে
জামায়াতে ইসলামী অবশ্য গোয়েন্দা কার্যক্রমকে পাত্তাই দিচ্ছে না। দলটির ঘোষিত মেয়র প্রার্থী ও নগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান হেলালী বলেই ফেললেন, ‘সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার জরিপ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাদের জরিপের ওপর আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে না।’
তবে গোয়েন্দা জরিপের মাধ্যমে খারাপ ভাবমূর্তির লোকজন চিহ্নিত হবে, এমনটাই মনে করেন নগরীর ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডের সম্ভাব্য প্রার্থী নগর যুবদলের সাবেক সহসভাপতি সাহেদ আকবর। তার মতে, এর মাধ্যমে নির্বাচনের আগেই চিহ্নিতরা কোণঠাসা হয়ে যাবে।
নির্বাচনী জরিপ নিয়ে আলাপ হয় সিটিএসবির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তাদের ভাষ্য, নির্বাচনের আগেভাগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি নিখুঁত ডেটাবেজ তৈরি করে রাখতে তাদের এ তৎপরতা। একই সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেউ যেন রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে নির্বাচনের মাঠে পুনর্বাসনের সুযোগ না পান, সেটিও নিশ্চিত করা।
এই বিভাগে দায়িত্বে থাকা উপকমিশনার মোহাম্মদ গোলাম রুহুল কুদ্দুস গোয়েন্দা কার্যক্রমের সত্যতা নিশ্চিত করে বললেন, ‘এটি একেবারেই আমাদের নিজেদের বিষয়। বাইরে কীভাবে গেল জানি না। রুটিন ওয়ার্ক। নিয়মিত আমরা করে থাকি।’
জানা গেল, গত ২০ জুন সিটিএসবির উপকমিশনার ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সম্ভাব্য প্রার্থীদের তথ্যাদি প্রেরণ’-সংক্রান্ত আদেশ জারি করেন। এতে সব জোনের পরিদর্শকদের দুটি ছক সরবরাহ করা হয়। ২৭ জুনের মধ্যে তাদের সম্ভাব্য মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করে সিটিএসবির রাজনৈতিক শাখায় জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। দায়িত্বপ্রাপ্তদের সরবরাহ করা ফরমে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম-ঠিকানা, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ ব্যক্তিগত বিভিন্ন তথ্য যাচাই করতে বলা হয়েছে। প্রার্থীর ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক ভাবমূর্তি, মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয়তা কেমন, মামলার আসামি কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের পিএস-এপিএস ও ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীর আমলনামা জানতে চাওয়া হয় এতে। প্রার্থীর রাজনৈতিক অনুসারীদের বিবরণও দিতে বলা হয়। বাদ যায়নি স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণের তথ্যও। এমনকি কার ফেসবুকের কয়টি আইডি এবং সেসব আইডি থেকে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সেটিও তুলে ধরতে বলা হয় রিপোর্টে।
মাঠে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা বললেন, ‘যিনি প্রার্থী হবেন তার বিরুদ্ধে মামলা থাকলে তা কোন আমলে হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে নাকি পরে, এসব আমরা যাচাই-বাছাই করছি। এলাকায় প্রার্থী কোনো বাহিনী গড়ে তুলেছেন কি না, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং লালনের মতো অপরাধে জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছি।’
নির্ধারিত ২৭ জুনের মধ্যে জরিপ শেষ না হওয়ায় গত শুক্রবার আশুরার বন্ধের দিন দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন সিটিএসবির উপকমিশনার। সেই বৈঠক থেকে গোয়েন্দাদের আরও সময় দেওয়া হয়েছে, জানালেন এক কর্মকর্তা। তিনি বললেন, ‘দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জরিপ কাজ শেষ করার নির্দেশনাও।’
চসিকের সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি। বিতর্কিত ওই নির্বাচনে বিজয়ী মেয়র আওয়ামী লীগের রেজাউল করিম চৌধুরী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পালিয়ে যান। নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে করা এক মামলার রায় পেয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ডা. শাহাদাত হোসেন ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর থেকে এখনো মেয়রের চেয়ারে আছেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ৪১ জন সাধারণ কাউন্সিলর ও ১৪ জন নারী কাউন্সিলর পদ শূন্য ঘোষণা করে। ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেজাউল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ষষ্ঠ নির্বাচিত পরিষদের প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আইন অনুযায়ী, প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ। সে হিসেবে ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে বর্তমান মেয়র শাহাদাতের দাবি, আদালতের রায় অনুযায়ী তার মেয়াদ শেষ হবে ২০২৯ সালের ৩ নভেম্বর।




