বন্দর চেয়ারম্যানের একটি আদেশ ও নানা প্রশ্ন

ছবি: আগামীর সময়
ফাইল প্রসেস বা বিল পাস করতে আর্থিক অনিয়মে জড়িত বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি পদক্ষেপের হুশিঁয়ারি দিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান।
গতকাল মঙ্গলবার এমন এক সময়ে এই আদেশ দিলেন যখন বন্দর চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ১ বছর ১০ মাসের বেশি দায়িত্ব পালন করছেন।
দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থাকার পর শেষদিকে এসে নজিরবিহীন এই আদেশ নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে। এমন কথাও আলোচনা হচ্ছে যে, বন্দরে নগদ টাকার লেনদেন, ঘুষ, স্পিড মানি এসব অভিযোগের বিষয় এখন আরও যৌক্তিক ও জোরালো হয়ে উঠল।
এই আদেশ বাস্তবায়ন বেশ চ্যালেঞ্জিং। বন্দর ব্যবহারকারী এক ব্যবসায়ী নেতা বলেছেন, ‘বিষয়টা কী এমন? যে গতকাল পর্যন্ত দুর্নীতি হয়েছে তিনি স্বীকার করলেন। আগামীকাল থেকে সেটি বন্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। বাস্তবে এই আদেশ স্ট্যান্ডবাজির মতো।’
আবার অনেকেই বলছেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে তার এই কঠোর অবস্থান আগে কেন দেখালেন না। দেখাতে পারলে বন্দরে দীর্ঘদিনের ফাইল জট ও হয়রানির অবসান ঘটত। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হতো।
চট্টগ্রাম বন্দরে সদস্য (প্রশাসন) হিসেবে দীর্ঘসময় কাজ শেষে এখন অবসরে সরকারের যুগ্ম সচিব জাফর আলম।
তার ভাষ্য, ‘আদেশে যেগুলো আছে সেসব নতুন করে বলার কিছু নেই। সরকারি চাকরি আইন ও বন্দর কর্মচারী আচরণবিধিতে এসব কথা সুষ্পষ্ট বলা আছে। কাউকে নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়া বা বিশেষ কোনো কারণে করা হলো কি না আমার জানা নেই।’
আদেশে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী ফাইল প্রসেস বা প্রক্রিয়াকরণ করার জন্য কোনো প্রকার লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া যায় এবং তা প্রমাণিত হয়। তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন এবং চবকের নিজস্ব কঠোর প্রবিধানমালা অনুযায়ী চাকরিচ্যুতিসহ সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আদেশে সেবাগ্রহীতা ও ঠিকাদারদের জন্যও কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কোনো ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যদি কোনো বিল পাস কিংবা ফাইল প্রসেস করার উদ্দেশ্যে বন্দরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে কোনো প্রকার আর্থিক সুবিধা দেন অথবা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে ওই ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করা হবে এবং একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী সেবাগ্রহীতারা যদি চবকের কোনো শাখা বা দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে কোনো ধরনের হয়রানি, বিলম্ব বা অনৈতিক দাবির সম্মুখীন হন, তবে তারা যেন দেরি না করে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ সরাসরি চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খোকন এই আদেশের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘বন্দর চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত লাগার এমন কিছু ঘটেছে বলেই হয়তো এ আদেশ। অনিয়ম হলে প্রায় দুই বছর ধরে দায়িত্বে থাকার সময়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি কেন। তার বিরুদ্ধে দুদক বিভিন্ন অনিয়মের তদন্ত করছে। তিনি সেই তদন্ত এগোতে দিচ্ছেন না।’
এসব বিষয়ে মতামত জানার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের মোবাইল ফোনে কল করলে সাড়া মেলেনি। এসএমএস পাঠিয়ে কথা বলতে চাইলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।




