৪০ বছর ধরে বানাচ্ছেন বিশ্বকাপের পতাকা

ফিফা বিশ্বকাপের পতাকা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগরেরা। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। চট্টগ্রাম সিনেমা প্যালেসের লয়েল রোড পতাকা তৈরির বিতান থেকে তোলা ছবি। রনি দে, চট্টগ্রাম
বিশ্বকাপের ঘণ্টা বেজে গেছে, ফুটবল উন্মাদনা শুরু। পতাকা উঠতে শুরু করেছে ভবনের ছাদে। আর্জেন্টিনার আকাশি নীল, ব্রাজিলের সবুজের বুকে হলুদ। আরও কত কী। 'সব খেলার সেরা ফুটবল' গানের মতোই বাঙালি মেতেছে ফুটবল বিশ্বের রঙিন ও জমজমাট এই আসর নিয়ে।
উন্মাদনার প্রথম প্রকাশ পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে। তাইতো সবাই ছুটছেন প্রিয় দলের পতাকা সংগ্রহে। পতাকার অন্যতম কারিগর বা টেইলার্স আবু আহমেদ। তার পতাকা বিতান ঢেকে গেছে নানা দেশের পতাকায়। চট্টগ্রাম নগরের সিনেমা প্যালেস এলাকায় তার ছোট্ট দোকান। এ আবু আহমেদ ‘আবু খলিফা’ নামেই পরিচিত। চট্টগ্রামে টেইলার্স মালিকদের স্থানীয় ভাষায় খলিফা বলা হয়। ৪০ বছর ধরে বিভিন্ন রকমের পতাকা নিয়ে তার কারবার। দোকানের ভিজিটিং কার্ডও নানা দেশের পতাকায় সাজানো।
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা বেশি টের পাওয়া যায় তার দোকানেই। নগরের ফুটবলপ্রেমীরা ভিড় করছেন আবু আহমেদের পতাকা বিতানে। বিশ্বকাপ ফুটবলে যেসব দল অংশ নিচ্ছে, তাদের জাতীয় পতাকা বানানো ও বিক্রির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন আবু আহমেদ। পাশাপাশি তিনি দলগুলোর জার্সিও বিক্রি করছেন।
বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বাংলাদেশ কার্যত দুটি শিবিরে ভাগ হয়ে পড়ে। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আবু জানান, ‘দলই দুটি— ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। দুই দলের ৫ হাজার পতাকা বিক্রি করে ফেলেছি। আরও বানাচ্ছি। দুটি ছাড়া অন্য দলগুলোর বেইল নেই।’
বিশ্বকাপ ফুটবল সামনে রেখে আবু আহমেদ গত ৬ মাস আগে থেকে পতাকা তৈরির কাজ শুরু করেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন দলের সাত হাজার পতাকা বানানো হয়েছে। পতাকা বিক্রি শুরু হয় মাসখানেক আগে।
আর্জেন্টিনার একটা ৯০ ফুট দৈর্ঘ্যের পতাকা এরই মধ্যে বিক্রি করেছেন ৫ হাজার টাকায়। ৫০ ফুট দৈর্ঘ্যের তিনটি ব্রাজিলের পতাকা বিক্রি করেছেন প্রতিটি আড়াই হাজার টাকায়। বেশিরভাগ পতাকা খুচরা বিক্রেতারা নিচ্ছেন। এ ছাড়া সাধারণ ফুটবল-ভক্তদেরও প্রধান ভরসার নামও আবু খলিফা।
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ছাড়া জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেনসহ আরও কিছু দলের পতাকা-জার্সির চাহিদা রয়েছে বলে জানান আবু আহমেদ। তিনি বলেন, ‘পাড়া-মহল্লা থেকে বড় বড় পতাকার অর্ডার আসতে শুরু হয়েছে।’
কয়েক দিন আগে ইয়াসির নামের এক ফুটবলভক্ত চারটা ব্রাজিলের পতাকা নিয়েছেন। ইয়াসির জানান, প্রতিবার বিশ্বকাপে আবুর কাছ থেকে তিনি পতাকা ও জার্সি কেনেন। বড় আকারের পতাকার জন্য তাঁর দোকানে তরুণ-যুবকেরা ছুটে আসছেন এখন।
তিনি জানালেন, ১৯৮০ সালের পর থেকে পতাকা তৈরি ও বিক্রি করছেন। প্রথম দিকে হকার মার্কেটে ছিলেন। এরপর সিনেমা প্যালেস এলাকায় পতাকা বিতান নামে দোকানটা শুরু করেন।
একই এলাকায় আবদুল কাদেরও পতাকা বিক্রি করেন। তিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। পতাকার পাশাপাশি জার্সি বিক্রি করেন। আরও কয়েকজন ওই এলাকা এবং হকার মার্কেটে পতাকা বিক্রি করেন।
সময় যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বেশি পতাকায় ছেয়ে যাবে ভবন, ছাদ, দোকান এমন প্রত্যাশা পতাকা বিক্রেতাদের। জাতীয় দিবসগুলোয় কিছু পতাকা বিক্রি হলেও বিশ্বকাপের মতো এত পতাকা কখনো বিক্রি হয় না বলে জানান আবু আহমেদ। আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোয় বিশ্বকাপ ফুটবলের যে ঢেউ বিশ্বব্যাপী লেগেছে তার আঁচ বাংলাদেশেই বেশি মনে হয়।
বাঙালির বিশ্বকাপ আগুনে ঘি ঢালার মতো উৎসাহ জুগিয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। কীভাবে? ওই যে গত ঈদুল আজহায় বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদের শুভেচ্ছা জানাল তারা। ঢেউ উঠেছে।
সেই ঢেউয়ের অন্যতম রসদদাতা আবু আহমেদ কিন্তু ৪৮ দলের সমর্থক, 'আমার কোনো দল নেই। আমি সব দলের সমর্থক।' একটা দলের সমর্থক হয়ে ব্যবসা খারাপ করতে চান না আবু আহমেদ।




