বেলা বিস্কুটের গণি বেকারির আধুনিক রূপ

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গণি বেকারি এখন নতুন আঙিকে তৈরি করা হয়েছে। ছবি: রনি দে
চট্টগ্রামের কবি ও সাংবাদিক ওমর কায়সার তার লেখা আঞ্চলিক এক ছড়ায় বেলা বিস্কুট নিয়ে মজা করেছেন এভাবে— ‘বেলা বিস্কুট গরম চা/মজা গরি ডুবাই খা/ঘরত গরবা আইস্যি/বেলা দেহি হাইস্যি।’ (বেলা বিস্কুট গরম চা/মজা করে ডুবিয়ে খাও/ঘরে এসেছে মেহমান/বেলা বিস্কুট দেখে হেসে দিয়েছে।)
চট্টগ্রামের মানুষের সাথে বেলা বিস্কুটের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সকালে বা বিকেলে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের সাথে বেলা বিস্কুট এখানকার মানুষের প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রামের খাবারের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম মজাদার আইটেম বেলা বিস্কুট। আর সেই বেলা বিস্কুটের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে গণি বেকারির নাম। এখনো পুরনো ও মান্ধাতার আমলের পদ্ধতি অনুসরণ করে বেলা বিস্কুট তৈরি করছে গণি বেকারি। চার প্রজন্ম ধরেই চলছে এই ব্যবসা।
কি পরিমাণ জনপ্রিয় হলে এলাকার পরিচিতিও গণি বেকারির নামে হয়ে যায়। চট্টগ্রাম কলেজ রোড হয়ে জামালখান যাওয়ার পথে যে মোড়টি পড়ে সেটি গণি বেকারি মোড় নামে পরিচিত। এই এলাকায় একটি গলিও আছে। নাম ‘গণি বেকারি গলি’। চট্টগ্রামের প্রায় সব মানুষই চেনে এই গণি বেকারি আর তাদের বিখ্যাত বেলা বিস্কুট।
আশির দশকে দৈনিক প্রায় ৫০০ প্যাকেট বেলা বিস্কুট বিক্রি হতো। এখন দৈনিক ১৬০ থেকে ২০০ প্যাকেট বিক্রি হয়। এক প্যাকেটের দাম ১১০ টাকা। বেলা বিস্কুট ছাড়াও বন, বাটারবন, পাউরুটি, নোনতা বিস্কুট, অন্যান্য বিস্কুট, পেটিস, চানাচুরসহ ঝাল আইটেমও এখন পাওয়া যায়।
সময়ের সঙ্গে গণি বেকারির আদল এবং বিস্কুটের রূপ বদলেছে নানা সময়ে। বদলেছে স্বাদও। এবার বেলা এবং গণি বেকারির আদ্যোপান্ত জানা যাক। এই বেলা বিস্কুট তৈরির যাত্রা শুরু হয় বেকারি প্রতিষ্ঠা হওয়ারও আগে। দুইশ বছর আগে ময়দা ও চিনি মিশ্রিত গোলাকার শক্ত এই বিস্কুটের প্রচলন ঘটে। এ কারণে বেলাকে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন বিস্কুটও বলা হয়।
পরে আবদুল গণি সওদাগরও আটা বা ময়দা, চিনিসহ নানা উপকরণে তৈরি গোলাকার পুরু বিস্কুট তৈরি করেন। সেটা ১৮৭০ সালের কথা। তার নামানুসারেই তৈরি হয় গণি বেকারি বেলা।
বেলা বিস্কুট গরম চা/মজা গরি ডুবাই খা/ঘরত গরবা আইস্যি/বেলা দেহি হাইস্যি
গবেষকদের মতে, আবদুল গণি সওদাগরের পূর্বপুরুষ লাল খাঁ সুবেদার ও তার ছেলে কানু খাঁ মিস্ত্রির হাত ধরে বেকারি পণ্য তৈরির সূচনা হয় চট্টগ্রামে। সে সময়ে এই এলাকায় পর্তুগিজদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। তাদের খাদ্যাভ্যাসে ছিল রুটি, পাউরুটি, বিস্কুটসহ নানা বেকারি পণ্য। প্রচলিত রয়েছে পর্তুগিজদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের এমন খাদ্যাভ্যাসের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পুরোদমে বেকারির যাত্রা শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে দোকানটির একবার সংস্কার করা হয়। চার প্রজন্মের এই প্রতিষ্ঠান এখন দেখাশোনা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এহতেশাম। আবার এই বদলের কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘এত বছরের পুরনো দোকানটি মাঝে একবার সংস্কার করা হলেও আবারো বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় ধসে পড়ার মতো অবস্থা। আবার কিছু জায়গা দিয়ে বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে।’
গণি বেকারির রূপ বদলাতে শুরু হয় নির্মাণকাজ। শেষ করে এখন পণ্য সাজানো হচ্ছে নতুন রূপে। পুরনো দোকান সংস্কার করে বানানো হয়েছে দোতলা ভবন, যা প্রায় ৫ হাজার বর্গফুট। এর নিচের অংশের সামনে থাকবে বেকারি আর পেছনে কারখানা।
পুরনো প্রতিষ্ঠানটির দুই তিন দোকান পর মডার্ন গণি বেকারি নামে আরেকটি দোকান হয়েছে। ১৬ বছর আগে দুই ভাইয়ের মধ্যে পুরনো গনি বেকারিটি ভাগাভাগি হয়ে যায়। যার একটি হলো সবার পরিচিত পুরনো গনি বেকারি অন্যটি মডার্ন গণি বেকারি।
ঐতিহ্যবাহী এই বেকারিতে এখনো সনাতন পদ্ধতিতেই বিস্কুট ও অন্যান্য বেকারি পণ্য তৈরি হচ্ছে। ১৫০ বছর আগেও যে তন্দুর চুলা ব্যবহার করে বিস্কুট তৈরি করা হতো এখনো সেই চুলাতেই তৈরি হয় বেলা বিস্কুট। প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ জন কর্মী যুক্ত রয়েছেন এই বেকারির সাথে।
মাটির যেই চুলা মানে তন্দুরে বিস্কুট বানানো হয় সেটি সম্পর্কে এহতেশাম জানান, ‘মেশিনে করলে সেই ঐতিহ্য আর থাকবে না। স্বাদেও ভিন্নতা তৈরি হবে। তাই এখন তন্দুরেই সব করা হয়।’





