মেজবানির মাংসকে টেক্কা দিচ্ছে ‘ওরশ বিরিয়ানি’

ছবি: আগামীর সময়
চট্টগ্রামের খাবার খাবেন? এরকম প্রশ্নের মোক্ষম জবাব মেজবানি মাংস! বছরের পর বছর ধরে ঝাল ও মসলাদার এই মাংসের জনপ্রিয়তা একইরকম। ধোঁয়া ওঠা সাদা গরম ভাতের সঙ্গে গরম মেজবানির মাংস যেকোনো ভোজন রসিককে আপ্লুত আনন্দিত করে তুলবে মুহূর্তেই। কিন্তু গত দুই বছর ধরে মেজবানির মাংসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে ‘ওরশের বিরিয়ানি’।
বন্দর নগরীর এমন কোনো এলাকা নেই, যেখানে ওরশের বিরিয়ানির দোকান নেই। বরং এটাই এখন বাস্তবতা মেজবানির মাংসের চেয়ে ওরশের দোকানের সংখ্যা বেশি।
কী এমন ঘটনা ঘটল যে হঠাৎ করেই ওরশের বিরিয়ানির এত জনপ্রিয়তা। সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। সহজে পাওয়া যায়। দামও তুলনামূলক কম। খাওয়ারও ঝক্কিঝামেলা নেই। মেজবানির মাংস খেতে লাগবে সাদা ভাত। ওরশের বিরিয়ানির ভেতরেই মাংস। একপ্লেটে খাবার সারা। নগরীর যেকোনো দোকানে এক জনের মেজবানির মাংস, সাদা ভাতা খেতে লাগে ৩০০ টাকা। ওরশের বিরিয়ানিতে লাগে ১৫০ টাকা। অপূর্ব স্বাদ এই বিরিয়ানির। দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার এটাও একটা কারণ।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মেজবান চট্টগ্রামের প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো সামাজিক আতিথেয়তার প্রতীক। ১৬শ শতাব্দীর বিখ্যাত কবি সৈয়দ সুলতানের ‘নবীবংশ’ কাব্যেও এর লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়। ফারসি শব্দ ‘মেজবান’ যার অর্থ অতিথি আপ্যায়নকারী, তা থেকেই এই উৎসবের নাম। ধনী-গরিবের বৈষম্য ভুলে সবাই একসাথে বসে খাওয়ার এই সামাজিক মেলবন্ধন থেকেই জন্ম আজকের বিখ্যাত ‘মেজবানি মাংস’।
অন্যদিকে, ‘ওরশ বিরিয়ানি’র ইতিহাস মূলত মাজারের আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। আরবি ‘উরুস’ থেকে আসা ওরশ উপলক্ষে সুফি সাধকদের ওফাত দিবসে ভক্তদের যে ‘তবারক’ দেওয়া হতো, তা থেকেই এর জন্ম। প্রায় এক শতাব্দী আগে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের আধুনিক রূপের শুরু। ৫০ বছর আগে লাখ লাখ ভক্তের খাবার দ্রুত তৈরি করতে বাবুর্চিরা চাল ও মাংস একসাথে বড় ডেকসিতে দমে রান্না শুরু করেন।
চট্টগ্রামের সাগরিকা এলাকার চাঁটগাইয়া ওরশ বিরিয়ানির দোকানের বাবুর্চি মোহাম্মদ মফিজ জানালেন, ‘ওরশ বিরিয়ানির রান্নার ধরণ আলাদা। মাংস আর চাল একসাথে দমে এমনভাবে বসানো হয়। মসলা চালের ভেতরে ঢুকে যায়। মেজবানের মতো আলাদা ঝোল বা ডালের প্রয়োজন হয় না। এক ডেকসিতেই খাবারের জাদু।’
কিন্তু কেন মেজবানকে টেক্কা দিচ্ছে ওরশ বিরিয়ানি? ভোজনরসিকরা বলছেন, মেজবানি মাংস খেতে হলে সাদা ভাত, চনার ডাল আর নলার ঝোলের আয়োজন লাগে। কিন্তু ওরশ বিরিয়ানি এক প্লেটেই পেট ভরে ও স্বাদে মন ভরে।
দোকান মালিক আতিকুল ইসলাম বললেন, ‘মেজবানি ফুল প্যাকেজের তুলনায় ওরশ বিরিয়ানি বেশ সাশ্রয়ী। তাই মধ্যবিত্ত ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘স্ট্রিট ফুড’ হিসেবে প্রথম পছন্দ এ বিরিয়ানি। সন্ধ্যার পর এর বিক্রি মেজবানের চেয়েও বেশি।
ভোজনরসিকদের মতে, এটি আসলে কোনো খাবারের লড়াই নয়, বরং চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ খাদ্য সংস্কৃতির এক সুন্দর বিবর্তন। মেজবানি মাংস যেমন চট্টগ্রামের ঐতিহ্য আর অহংকার হিসেবে টিকে থাকবে। একইভাবে ওরশ বিরিয়ানিও তার নিজস্ব স্বাদে জয় করে নিবে আধুনিক চট্টগ্রামকে।




