‘ধার করেও স্ত্রীকে বাঁচাতে পারলাম না, মেয়ে দুটিকে দেখবে কে’

রয়েল হসপিটাল, চট্টগ্রাম— সংগৃহীত
‘চট্টগ্রামে আমার কেউ নেই। আইসিইউতে ভর্তি স্ত্রী। দুইটা ছোট ছোট মেয়ে। ইয়াসমিন দুই বছরের। তাকে কোলে নিয়ে গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আইসিইউতে ঢুকি। স্ত্রী মরিয়ম তখন আমার হাত ধরে বলল, ‘আমার বেশি কষ্ট হচ্ছে। আমি কি আর বাঁচুম না?’
স্ত্রীকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে তখন মেহেদি হাসান রুবেল আইসিইউ থেকে বের হয়ে আসেন। ডাক্তাররা জানিয়ে দিয়েছিলেন তার স্ত্রী সংকটাপন্ন। হাসপাতালের সম্ভাব্য বিলের টাকা জোগাড় করার জন্য বের হয়ে পড়েন রুবেল। বিকাল ৪টার দিকে রয়েল হাসপাতাল থেকে ফোন আসে, ‘স্ত্রীর অবস্থা খারাপ, দেরিতে এলে পাবেন না।’ রুবেল তাড়াতাড়ি গিয়ে আর মরিয়মকে জীবিত পাননি।
শনিবার বিকালে ডেঙ্গুতে মারা যান মরিয়ম বেগম (৩১)। এ নিয়ে এবার চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হলো। এ পর্যন্ত ৪৪৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ১৪৫ জন আক্রান্ত হন চলতি মাসের ১১ দিনে।
মৃত্যুর আগে মরিয়ম মেয়ে ইশরাত জাহানকে নিয়ে এক সপ্তাহ এই হাসপাতালে যুদ্ধ করেছিলেন। সাড়ে ৫ বছরের মেয়েটিরও ডেঙ্গু হয়েছিল। চার দিন আইসিইউতে রেখে সুস্থ করে বাসায় ফিরেছিলেন গত বৃহস্পতিবার। ডেঙ্গু আক্রান্ত মেয়েকে সুস্থ করতে নিজের অসুস্থতা পাত্তা দেননি। শুক্রবার সেই হাসপাতালেই ভর্তি হতে হলো।
রুবেল গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করেন। বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। তাদের দুটি মেয়ে। বড় মেয়ে ইশরাত জাহানের বয়স সাড়ে ৫ বছর। কয়েকদিনের জ্বরের পর ইশরাতকে গত ২ জুলাই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন।
রুবেল জানান, ‘মেয়েটির ডেঙ্গু পজিটিভ ছিল। ওখানে অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। মেডিকেল থেকে ডাক্তারের পরামর্শে ৫ জুলাই রয়েল হাসপাতালে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) ভর্তি করি। ৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) সুস্থ করে বাসায় নিয়ে যাই। তবে ওখানে থাকা অবস্থায় স্ত্রীর জ্বর আসে। মেয়ের সঙ্গে সারাক্ষণ আইসিইউতে থাকত মরিয়ম।’
বুধবার রয়েল হাসপাতালে মরিয়মকে ডাক্তার দেখানো হয়। তার রক্ত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। শুক্রবার স্ত্রীকে নিয়ে রুবেল আবার রয়েল হাসপাতালে ছোটেন। সাধারণ কেবিনে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শুরু হয়।
রুবেল জানান, ‘রাত একটার দিকে অস্থিরতা শুরু হয় মরিয়মের। চিকিৎসকের পরামর্শে তখন তাকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি বাচ্চাসহ বাইরে অপেক্ষায় ছিলাম। সকালে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করি আইসিইউতে। ডাক্তার আমাকে বলে দিয়েছেন আগেই ডেঙ্গুতে তার ফুসফুস, হার্টের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। এরপর টাকা জোগাড় করতে চলে যাই। বিকালে ফোন আসে হাসপাতাল থেকে। তখনই হয়তো মারা গেছে। আমাকে জানায়নি।’
হাসপাতালে স্ত্রী ও মেয়ের চিকিৎসা বাবদ খরচ হয় এক লাখ টাকা। ধারকর্জ করে বিল মিটিয়েছেন। তারপরও রুবেলের আক্ষেপ, ‘এত টাকা ধার করেও স্ত্রীকে বাঁচাতে পারলাম না। এখন মেয়ে দুটিকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছি। কে দেখবে, কে রাখবে? মেয়েরা শুধু মাকে খোঁজে।’





