কর্পোরেশন পাবলিক লাইব্রেরি : ১২২ বছরের জীবন্ত আর্কাইভ

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পাবালিক লাইব্রেরি পাঠকেরা তাদের পছন্দের বই পড়তে ব্যস্ত। কেউ পুরোনো বই পড়ছেন, কেউ দৈনিক পত্রিকা পড়তে ব্যস্ত। ছবি- রনি দে, চট্টগ্রাম
একটি ঐতিহ্যবাহী শহরের ইতিহাস শুধু তার স্থাপনায় নয়, সংরক্ষিত থাকে বইয়ের পাতায়ও। শত শত বছরের সেই ইতিহাসকে আগলে রেখেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পাবলিক লাইব্রেরি।
১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ পাঠাগারের নাম ছিল ‘চিটাগাং মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরি’। শুধু চট্টগ্রামের নয়, দেশের অন্যতম প্রাচীন পাবলিক লাইব্রেরি এটি। সমৃদ্ধ এই পাবলিক লাইব্রেরির নাম এখন ‘মাহবুব উল আলম চৌধুরী’র নামে। তিনি হলেন মহান একুশের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসি দাবি নিয়ে এসেছি’র রচয়িতা।
প্রথমে আন্দরকিল্লায় পৌরসভার কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত এই গ্রন্থাগার ১৯২৩ সালে লালদীঘির পাড়ে বর্তমান ভবনে স্থানান্তরিত হয়। স্বাধীনতার পর এর নামকরণ করা হয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পাবলিক লাইব্রেরি।
দেশভাগের আগেই কলকাতাভিত্তিক চট্টগ্রাম সমিতির একটি লাইব্রেরি ছিল। সেখান থেকে মূল্যবান সংগ্রহ এই গ্রন্থাগারে স্থানান্তরিত হয়। এখানে আজও সংরক্ষিত রয়েছে ব্রিটিশ আমলের নথি, শতবর্ষী সরকারি গেজেট, কলকাতা থেকে প্রকাশিত ঐতিহাসিক সাময়িকী, পুঁথি ও দুর্লভ গ্রন্থ। এটি কেবল একটি পাঠাগার নয়, বরং ইতিহাসের জীবন্ত আর্কাইভ।
এখানে প্রায় ৪৫ হাজার বই সংরক্ষিত রয়েছে। বাংলা, ইংরেজি, আরবি ও উর্দু সাহিত্যের পাশাপাশি ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন, ভূগোল, ধর্ম, বিশ্বসাহিত্য, গবেষণা এবং রেফারেন্স বিষয়ক বই। আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, তারা শঙ্কর, নীহার রঞ্জন গুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নসীম হিজাযী, অন্নদা শঙ্কর, আহমদ ছফা,সহ বিখ্যাত লেখকদের অনেক বই।
গ্রন্থাগারের সবচেয়ে বড় শক্তি এর দুর্লভ সংগ্রহ। ঐতিহাসিক সাময়িকী মোহাম্মদী, পুরবী ও পূর্বাভাস, শেক্সপিয়ারের বিরল নাটক, রোমিও-জুলিয়েটের প্রথম সংস্করণ, জন মিল্টনের রচনাবলি, ভারতীয় টেরাকোটা শিল্পবিষয়ক গ্রন্থসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক বই এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি শতাধিক বছরের পুরোনো 'ইউসুফ জুলেখা', 'সেকান্দর বাদশা', 'দেলদার কুমার' এবং 'শিরি-ফরহাদ' সংরক্ষিত এসব পুঁথি বাংলা সাহিত্যের মূল্যবান নিদর্শন।
লাইব্রেরির একটি বিশেষ আকর্ষণ ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা সংগ্রহ। ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ত্যাগের সময় তাদের ব্যবহৃত কিছু মূল্যবান বই এই লাইব্রেরিতে দান করে যায়, যা আজও সংরক্ষিত রয়েছে। ২০০০ সাল থেকে দৈনিক আজাদী ও ইত্তেফাক পত্রিকার নিয়মিত বাঁধাই সংরক্ষণ ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু কর্নার, মুক্তিযুদ্ধ কর্নার এবং শিশু কর্নার নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করে দিচ্ছে।
শুধু সাধারণ পাঠক নয়, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, লেখক, আইনজীবী এমনকি আদালতের কর্মকর্তারাও প্রয়োজনীয় তথ্য ও রেফারেন্স সংগ্রহে নিয়মিত এখানে আসেন। এমন অনেক সরকারি গেজেট ও ঐতিহাসিক দলিল এখানকার সংগ্রহে রয়েছে, যা অন্যান্য অনেক জায়গায় সহজে পাওয়া যায় না। এই লাইব্রেরির রেফারেন্স ব্যবহার করে ইতোমধ্যে বহু গবেষণাগ্রন্থ ও বই প্রকাশিত হয়েছে।
লালদিঘির দক্ষিণ পাড়ের সিটি কর্পোরেশন ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠতলায় এ লাইব্রেরি। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া গ্রীষ্মকালে বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত লাইব্রেরি খোলা থাকে। শীতকালে দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত লাইব্রেরি পাঠকের জন্য উন্মুক্ত।
নিয়মিত পাঠক প্রভাকর বড়ুয়া বললেন, ‘সরকারি বিভাগীয় পাবলিক লাইব্রেরি সংস্কারের জন্য বন্ধ থাকায় এখানে নিয়মিত আসি। এখানকার বইয়ের সংগ্রহ সমৃদ্ধ। বিশেষ করে রেফারেন্স বই ও পুরোনো পত্রিকার সংগ্রহ।’
পাঠাগারের সহকারী লাইব্রেরিয়ান কালাম চৌধুরী বললেন, ‘নিয়মিত নতুন বই সংগ্রহের মাধ্যমে পাঠকের আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি লাইব্রেরিটিকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ক্যাটালগের আওতায় আনা জরুরি। এতে পাঠক ও গবেষকেরা অনলাইনে বইয়ের তালিকা ও অবস্থান সম্পর্কে সহজেই তথ্য জানতে পারবেন। একই সঙ্গে দক্ষ লাইব্রেরিয়ান ও ক্যাটালগারসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা প্রয়োজন। এতে বিশাল সংগ্রহের সংরক্ষণ, শ্রেণিবিন্যাস এবং পাঠকসেবা আরও উন্নত হবে।’




