ইলিশ প্রজননে সাফল্যের দাবি, আহরণ কম
- প্রজননে সাড়ে ৩৯ কোটি জাটকা যুক্ত হওয়ার দাবি
- মৎস্য বিভাগের ডেটা বাস্তবের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ
- ৩ বছর ধরে আহরণ কমে যাচ্ছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাছে ভাতে বাঙালির চিরচেনা এক চিত্র। ইলিশ দড়িতে ঝুলিয়ে সন্ধ্যায় হাট থেকে বাড়ি ফেরা। কয়েক বছর আগেও গ্রামগঞ্জে এমন দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ত। বাঙালির খাবার টেবিলের বনেদি এ মাছ ধীরে ধীরে দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাচ্ছে। পাওয়া গেলেও তা নিম্ন বা মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে। সাগর-নদীতে ইলিশের উৎপাদন আর আগের মতো নেই। ফলে ভোক্তা ও জেলে- উভয়ের মধ্যেই আক্ষেপ ও হতাশা।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ইলিশের প্রজনন সফলতা দেখলেও জেলেরা বলছেন ভিন্ন কথা। গত বছর তাদের একটি গবেষণা অনুযায়ী ইলিশের গড় প্রজনন সফলতার হার ৪৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। মা ইলিশ থেকে সাড়ে ৩৯ কোটি পোনা-জাটকা প্রাকৃতিক মজুদে যুক্ত হয়েছে প্রজনন মৌসুমে। কিন্তু চলতি মৌসুমে ইলিশ আহরণের চিত্রে প্রজনন সাফল্যের এই দাবির কোনো প্রভাব নেই। ইলিশ ধরা পড়ছে একেবারেই কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবাধে পূর্ণ বয়স্ক ইলিশ ও জাটকা (১০ ইঞ্চির ছোট আকার) আহরণ, অবৈধ জাল, অনিবন্ধিত নৌকা ও বেহুন্দি জাল ব্যবহার ইলিশ আহরণে সংকট তৈরি করেছে। এ ছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে চাহিদা বেড়ে যাওয়া, নদীদূষণ, পলি জমা সর্বোপরি তদারকির অভাবও ইলিশ স্বল্পতার অন্যতম কারণ।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপ্রধান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘ইলিশের এবারের ট্রেন্ড ভালো মনে হচ্ছে না। প্রজনন মৌসুমে মা মাছের ডিম ছাড়ার সফলতা আছে কিন্তু মাছ ধরায় তার প্রভাব নেই।’
উৎপাদন তথ্যে অবিশ্বাস: দেশে দুইভাবে ইলিশ ও অন্যান্য মাছ আহরণের হিসাব করা হয়। একটি হলো সমুদ্র। অন্যটি অভ্যন্তরীণ নদী-খালকেন্দ্রিক আহরণ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ স্টক অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৮৫ সাল থেকে ইলিশ আহরণের পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে গত তিন বছরে আহরণের গ্রাফ নিচের দিকে।
গত বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ২৮৮ টন। কিন্তু তিন বছর আগে ২০২২-২৩ সালে ধরা পড়ে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। ইলিশ আহরণের চলতি মৌসুমের হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।
মৎস্য অধিদপ্তরের এই উৎপাদন তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহিদুল আলম। তিনি বললেন, ‘মৎস্য বিভাগ যে ডেটা দেয়, বাস্তবের সঙ্গে তা বিরোধপূর্ণ। ৫-৬ লাখ টন মাছ যদি ধরা পড়ত, তাহলে তো মাছের দাম এত বেশি হওয়ার কথা নয়। হাতে হাতে মাছ দেখা যেত।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘তিন বছর ধরেই ইলিশের গ্রাফ নিচের দিকে। ফিশিং মর্টালিটি বা অধিক পরিমাণে নির্বিচারে ইলিশ আহরণের কারণেই এই সংকট। এটি ভবিষ্যতের জন্য খুবই বিপজ্জনক। আমরা রুপচাঁদা, লাক্কা, তেইল্যার মতো অনেক মাছ হারিয়ে ফেলতে যাচ্ছি। ইলিশের ক্ষেত্রেও সে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। মা ইলিশ রক্ষায় আমাদের কোনো আইনও নেই।’
ইলিশের বেড়ে ওঠায় বাধা: একটি মা মাছ ১০ থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম ছাড়ে। যার মধ্যে ২ দশমিক ৫ শতাংশ বা তার বেশি পোনা হিসেবে রূপান্তরিত হয়। মা ইলিশ ডিম পাড়ার জন্য নদীতে আসে। ডিম ফুটে পোনা বের হওয়ার পর সেগুলো পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে জাটকায় পরিণত হয়। এরপর সমুদ্রে ফিরে যেতে শুরু করে। এক বছরের মধ্যে ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশ হয়।
এই অভিবাসনকালে মেঘনা, বিশখালী, পায়রা ও তেঁতুলিয়ার মতো প্রধান নদীগুলোর মোহনায় ছোট নৌকা ও শিল্প-ট্রলার দিয়ে অবৈধভাবে জাটকা শিকার করেন মৎস্যজীবীরা।
ইলিশ রক্ষায় গবেষকরা কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে ইলিশ ধরার জন্য জালের ছিদ্রের সঠিক মাপ (৬ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার) বজায় রাখা, জেলেদের মধ্যে জাটকা মাছ ধরা সম্পর্কে আরও সচেতনতা তৈরি করা ইত্যাদি অন্যতম।
প্রজননে সাফল্যের দাবি কতটা যৌক্তিক: ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি এই অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। প্রতি বছর আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাকে ভিত্তি ধরে ইলিশের প্রজনন সময় নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। ফলে মা মাছ রক্ষার্থে এবং প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ইংরেজি সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে ২২ দিনের জন্য মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়। এ সময় মা ইলিশ নদীগুলোয় এসে ডিম ছাড়ে।
গত বছর প্রজনন মৌসুমে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি গবেষণা চালায়। যৌথ গবেষণাটিতে যুক্ত ছিলেন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু কাউছার দিদার। তিনি জানালেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা, টহল কার্যক্রম ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রয়াস ইলিশ প্রজননে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে পরিপক্ব ইলিশের প্রায় অর্ধেক সফলভাবে ডিম ছেড়েছে। এ সফলতা ২০০১-০২ সালের তুলনায় ৯৮ শতাংশ বেশি। সাড়ে ৩৯ কোটি জাটকা প্রাকৃতিক মজুদে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে।
প্রজননের এই সফলতা আহরণে দেখা যাচ্ছে না। মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপ্রধান মোহাম্মদ কামরুজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘জাটকা যুক্ত হলে হবে না। তা বাঁচিয়েও রাখতে হবে। যে হারে ক্ষুদ্র ছিদ্রের জাল ব্যবহার করেন মৎস্যজীবীরা, সেটি এখন কল্পনার বাইরে। তারা একেবারে ছোট মাছ পর্যন্ত নিয়ে আসে। আইন দিয়ে এটি রোধের পাশাপাশি সচেতনতাও থাকতে হবে।’
ফিশারিঘাটে হাহাকার, দাম বাড়তি: ইলিশের প্রধান বিচরণক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় কক্সবাজার, চাঁদপুর, ভোলা, লক্ষ্মীপুর ও পটুয়াখালীকে। কক্সবাজার, বাঁশখালী, কাট্টলী উপকূল থেকে যেমন মাছ আসে, তেমনি মেঘনা অববাহিকার ইলিশও আসে ফিশারিঘাটে। বিশেষ করে নোয়াখালী, হাতিয়া, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর এলাকার ইলিশও পাওয়া যায় এই পাইকারি বাজারে।
চট্টগ্রামের প্রধান মৎস্য অবতরণকেন্দ্র ফিশারিঘাট। এই অবতরণকেন্দ্রের অধীনে ১০ হাজারের বেশি কাঠের ট্রলার রয়েছে। সমিতির পরিচালক মো. কাউছারুজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোতে মাছ পড়ার কথা। এখনো জো চলছে। কিছু ইলিশ ধরা পড়লেও তা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। এ কারণে দামও কমছে না।’
ফিশারিঘাটে ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের মণ বিক্রি হয় ৪২ হাজার টাকা। ২৫০-৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের মণ ২২-২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছিল। নগরের বিভিন্ন খুচরা মাছের বাজারে এক কেজি ওজনের কম ইলিশের দাম হাঁকা হচ্ছে ১ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। কেজিতে চারটি ধরে এমন ছোট ইলিশের দাম ৬০০-৮০০ টাকা।
তবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম এখনই হতাশ হতে রাজি নন। তিনি বললেন, ‘কিছু কিছু ইলিশ ধরা পড়ছে। আরও কিছুদিন মাছ ধরার মৌসুম রয়েছে। তখন বোঝা যাবে ইলিশ আহরণের প্রকৃত পরিমাণ। সরকারি হিসাবে দেশে মৎস্যজীবীর সংখ্যা সাড়ে ১৮ লাখের কিছু বেশি। মাছ ধরার জন্য বাণিজ্যিক জাহাজ রয়েছে ২৭০টি। এর মধ্যে ২৩২টির মতো সাগরে মাছ ধরতে যায়।’
বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা বাংলাদেশের। তবে মাছ ধরার উপযোগী এলাকা ৪ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও কম।



