সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন
রিমান্ডে ২০ দিন, উদ্ধার হয়নি ‘অস্ত্রের বাটও’

একাধিক মামলায় ডেভিড ইমনকে তিন দফায় ২০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি চাঁদাবাজি ও খুনোখুনির ঘটনায় সাবমেশিন গান (এসএমজি), ব্রাজিলের নাইন এমএম পিস্তল, চাইনিজ রাইফেলের মতো ভারী অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করেন আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের বাহিনীর সদস্যরা। প্রকাশ্যে এসব আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়ার তথ্যপ্রমাণ আছে পুলিশের কাছে। গ্রেপ্তারের পর হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলায় ডেভিড ইমনকে তিন দফায় ২০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।
কিন্তু তার ‘অস্ত্রভাণ্ডার’ থেকে একটি বন্দুকের বাটও উদ্ধার করা যায়নি। অস্ত্রগুলোর অবস্থানও শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। যদিও পুলিশ দাবি করছে ইমনের অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তারা পেয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৩০ জনের একটি বাহিনী নিয়ে ডেভিড ইমনের চট্টগ্রামে দাপিয়ে বেড়ানোর তথ্যও পুলিশের কাছে আছে। রিমান্ডে তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে এদের মধ্যে মাত্র দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পেরেছে।
গত ২৯ জুলাই ভারতের পালানোর পথে যশোর থেকে মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ তার কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র হিসেবে প্রদর্শন করে দুটি দেশীয় তৈরি এলজি যার জং ধরা লোহার পাইপ ও ভাঙাচোরা কাঠের বাট। একটি বিদেশি আধাপুরনো পিস্তল, ২টি বুলেট ও ম্যাগাজিন। একটি ধান কাটার কাঁচি। একটি কাঠের হাতলের হাসুয়া।
একে-৪৭ রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, সাব-মেশিনগান, নাইন শ্যুটার গানের যুগে ডেভিড ইমনের মতো সন্ত্রাসীর এসব দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পুলিশের মধ্যেই হাস্যরস সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন ওঠে সেগুলো আদৌ তার অস্ত্র কী-না। এবার ২০ দিন ধরে ইমনকে হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের পরও অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া কিংবা তেমন কোনো ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে না পারা নিয়ে আরও জোরেশোরে আলোচনা তৈরি হলো।
প্রশ্ন উঠেছে, ‘এ কী পুলিশের অক্ষমতা না-কী ইচ্ছে করে দায় এড়ানো!’
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘ডেভিড ইমন ও তার বাহিনীর সদস্যরা প্রত্যেকে প্রফেশনাল। কেউ কেউ মোর দ্যান প্রফেশনাল। এরা সহজে মুখ খুলতে চায় না। রিমান্ডে হাই প্রোফাইল সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের কাছ থেকে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। তার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একটা ধারণা পাওয়া গেছে। তবে তার চ্যালাচামুণ্ডা যারা আছে তারা এখন অবস্থান পরিবর্তন করে অনেকটা পুলিশের নাগালের বাইরে। অস্ত্রগুলোও ৪-৫ হাত বদল হয়ে গেছে। তথ্য যেহেতু পাওয়া গেছে, অস্ত্রগুলো অবশ্যই উদ্ধার করা হবে।’
গত ২ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই দফায় চট্টগ্রাম নগরীর চন্দনপুরায় স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের বাসায় চাঁদার দাবিতে গুলিবর্ষণ করেন ডেভিড ইমন বাহিনীর সদস্যরা। নগর পুলিশ জানিয়েছিল, একটি সাবমেশিন গান (এসএমজি), একটি ব্রাজিলের তরাস নাইন এমএম পিস্তল, একটি পয়েন্ট থার্টি টু বোরের চাইনিজ রিভলভার ও দুটি বিদেশি পিস্তল ব্যবহার করেছিলেন সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যে তিনটি অস্ত্র উদ্ধারের দাবি করেছিল নগর পুলিশ।
গত ১৩ জুন রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছিল চারটি বিদেশি পিস্তল ও দুটি শটগান। এগুলো ছিল ডেভিড ইমনের অস্ত্রভাণ্ডারের অস্ত্র।
একইভাবে নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে জোড়া খুন, পতেঙ্গায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, হাটহাজারীর বড়দিঘীর পাড়ে চাঁদার দাবিতে ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ভবনে হামলা-গুলিবর্ষণসহ আরও অনেক ঘটনায় ডেভিড ইমন বাহিনীর সদস্যদের ভারি অস্ত্রের ব্যবহারের মতো তথ্য পুলিশের কাছে আছে।
নাম প্রকাশ্যে আগ্রহী নন চট্টগ্রামের এমন এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বললেন, ‘একে-৪৭, এসএমজি, শাটারগান, পিস্তল, রিভলভার মিলিয়ে ডেভিড ইমনের কাছে অন্তত ২০টি ভারি অস্ত্র থাকার তথ্য আমরা পেয়েছি। তার বাহিনীর সদস্যদের কাছে আরও কিছু দেশীয় অস্ত্র আছে। ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পর অস্ত্রগুলো এখন রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মধ্যে বারবার হাতবদল হচ্ছে।’
২০ দিনের রিমান্ড শেষে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ আজ শনিবার ডেভিড ইমনকে আদালতে হাজিরের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে। এবার ইমনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানালেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসিন্দা ডেভিড ইমন বিদেশে পলাতক দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর অন্যতম নিয়ন্ত্রক। একই বাহিনীর আরেক নিয়ন্ত্রক রাউজানের রায়হান আলম। ইমন গ্রেপ্তার হলেও রায়হানকে ধরতে পারেনি পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, ইমন ও রায়হানের আলাদা দুই গ্রুপ মিলিয়ে শ’খানেক ক্যাডার আছে। ইমন চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে নগরী পর্যন্ত চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন। রায়হান বালুমহালে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, খুনোখুনিতে নেতৃত্ব দেয়। আগস্ট পর্যন্ত দুই গ্রুপ মিলিয়ে সাজ্জাদ বাহিনীর ৩৭ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
৩৭ জনের মধ্যে মাত্র দুজনকে ইমনের রিমান্ডে দেওয়া তথ্যে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে পুলিশ। এরা হলেন, ফটিকছড়ির সরওয়ার খান ও হাটহাজারীর মুন্না। কিন্তু ইমনকে অস্ত্র সরবরাহকারী, তার অস্ত্রভাণ্ডার সংরক্ষণকারী এবং মাঠপর্যায়ের অস্ত্র বহনকারীদের পুরো নেটওয়ার্ক কতটা শনাক্ত হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের ভাষ্য, ‘আসামি রিমান্ডে থাকলে তার সহযোগীরা বেশি সতর্ক থাকে। তখন অভিযান চালিয়েও অনেক সময় সুফল পাওয়া যায় না। বরং একটু সময় নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে অস্ত্রগুলো উদ্ধার ও ইমনের সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হবে।’







